নতুন রূপে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী মহাস্থানগড়

আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন প্রসিদ্ধ নগরী মহাস্থানগড়। এ নগরী সংস্কারে প্রাচীনত্ব ধরে রাখতে নানা কৌশলের আশ্রয় নেন বিশেষজ্ঞরা।

ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পুরনো ইট সংগ্রহ করেন তারা। ধুয়ে-মুছে চকচকে করা হয় সেগুলো। এরপর চুন-সুড়কি দিয়ে সেগুলো স্ব স্ব স্থানে বসিয়ে দেওয়া হয়।

পুরনো অবয়ব ধরে রাখতে উঁচু-নিচু স্থানগুলোকে মাথায় রেখে চালানো হয় সংস্কার কাজ। এবড়ো-থেবড়ো গাঁথুনির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বসানো হয় ইটগুলো। ঐতিহাসিক এ স্থাপনার স্থাপত্যশৈলীকে ফুটিয়ে তুলতে অত্যন্ত নিপুণ হাতে সেগুলোকে প্রতিস্থাপন করা হয়।

দর্শনার্থী ও পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়তে নির্মাণ করা হয়েছে বেশ কিছু আকর্ষণীয় স্থাপনা। সুযোগ-সুবিধা বাড়াতেও বিভিন্ন ধরনের দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে।

সব মিলিয়ে মহাস্থানগড়ের অঙ্গে লেগেছে নতুন রূপের ছোঁয়া।

পুণ্ড্রনগর খ্যাত মহাস্থানগড়কে ঘোষণা করা হয়েছে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী। গত ২৪ নভেম্বর ঢাকায় এসে সার্ক কালচারাল সেন্টারের পরিচালক ওয়াসান্থে কোতোয়ালার নেতৃত্বে সংস্থার একটি দল চূড়ান্ত এ ঘোষণা দেন। আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে এ ঘোষণা কার্যকর হবে।

ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক চলে গেছে বগুড়া শহর হয়ে। শহর থেকে সোজা ১২ কিলোমিটার উত্তরে যাওয়ার পর সেখান থেকে সামান্য পশ্চিমে গেলেই ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়।

২০১৬ সাল থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য বাংলাদেশের একটি অঞ্চলকে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী ঘোষণার উদ্যোগ নেয় সার্ক কালচারাল সেন্টার। কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, কুমিল্লার ময়নামতি ও মহাস্থানগড়কে বিবেচনায় নেওয়া হয়।

তবে প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের কারণে অন্য দু’টি স্থানের চেয়ে মহাস্থানগড় বরাবরই এগিয়ে ছিলো। প্রায় এক বছর আগে সার্ক কালচারাল সেন্টারের দুই কর্মকর্তা মহাস্থানগড় পরিদর্শনে এসে সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে প্রাচীন এ জনপদের সম্ভাবনার কথা বলেও গিয়েছিলেন।

তখন থেকেই আশায় বুক বেঁধেছিলেন জেলার সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। ছিল শুধু ঘোষণার অপেক্ষা। কাঙ্ক্ষিত সেই ঘোষণায় দারুণ খুশি এ অঞ্চলের মানুষ।

গত ০৩ ডিসেম্বর সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও সচিব আকতারী মমতাজ মহাস্থানগড় পরিদর্শনে আসেন। বহু ইতিহাস-ঐতিহ্যের এ নগরী ঘুরে ঘুরে দেখেন তারা। দেখেন চলমান উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজও।

প্রসিদ্ধ এই নগরীর চকচকে দূর্গপ্রাচীরও বেশ আকর্ষণীয় পর্যটকদের কাছে। এবড়ো-থেবড়ো এ প্রাচীরের অনেক স্থান বেশ বাঁকানো। দূর্গপ্রাচীর হয়ে জাদুঘরে আসার পথে নির্মাণ করা হয়েছে কাঠের আকর্ষণীয় সেতু। চারদিকে লাগানো হয়েছে সবুজ ঘাস ও গাছপালা। মাঝে শোভা পাচ্ছে থোকা থোকা বাহারি ফুল ও গাছ।

দর্শনার্থী ও পর্যটকদের জন্য গড়া রেঁস্তোরা, স্যুভেনির কর্নার, শৌচাগার, চারকোনা ছাউনির ঘর, বেঞ্চ, ডরমেটরি, আনসার ক্যাম্প, গাড়ি পার্কিং চত্বর, পিকনিক স্পট, রাস্তা কার্পেটিংও আকর্ষণ করে সকলকে।

ইট-পাথর, চুন-সুড়কি, বিশেষ ধরনের মেহগনি কাঠ ও টালি ব্যবহার করা হয়েছে এসব নির্মাণ কাজে। দেশের প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ দলের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার বিশেষজ্ঞরাও কাজগুলো করেন। অপরূপ এসব স্থাপনা অনেকটা নেপাল ও শ্রীলঙ্কার ঘর-বাড়ির আদলে নির্মাণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘সাউথ এশিয়া ট্যুরিজম ইনফ্রস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থার (ইউনেসকো) সহযোগিতায় এসব সংস্কার ও নানামুখী উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। অর্থায়নে রয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)।

২০১৪ সালের ০১ এপ্রিল এসব কাজ করতে সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে এডিবি। চুক্তি অনুসারে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৬ কোটি ৬১ লাখ ৭৩ হাজার ৪৮৩ দশমিক ৪৫ টাকা। ২০১৫ সালের ৩০ জুন থেকে কাজ শুরু হয়। চুক্তি অনুসারে ১৫ মাসের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার কথা থাকলেও পরে সময় বাড়ানো হয়।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক নাহিদ সুলতানা  জানান, পুরনো নকশা ও আধুনিকতার সংমিশ্রণে চলছে সংস্কার ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একটি ইউনিট প্রকল্পটির দেখ-ভাল করছে।

বগুড়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আশরাফ উদ্দিন  বলেন, মহাস্থানগড়কে সাংস্কৃতিক রাজধানী ঘোষণা করায় এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটবে। পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *