1. sm.khakon@gmail.com : bkantho :
বড় লোকদের জন্য কত সহজ আইন! - বাংলা কণ্ঠ নিউজ
সোমবার, ২২ জুলাই ২০২৪, ০১:৪৭ পূর্বাহ্ন

বড় লোকদের জন্য কত সহজ আইন!

এম এ মজিদ
  • শনিবার, ৪ মে, ২০২৪
  • ৬২ বার পড়া হয়েছে
বড় লোকদের জন্য কত সহজ আইন!

আমার কেন জানি বারবার মনে হয় ব্যতিক্রম কিছু আইন ব্যতিত বেশির ভাগ আইন করাই হয়েছে একটি শ্রেণীর মানুষকে ধমিয়ে রাখার জন্য। যে শ্রেণীকে টার্গেট করা আইনগুলো করা হয়েছে এই শ্রেণী এলিট শ্রেণী নয়। আজকে কয়েকটি আইন পড়ে আমার ধারনা আরও পাকাপুক্ত হল। তবে আমার পড়া আইনই শেষ আইন নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অধ্যাদেশ বা নতুন আইন করা হয়েছে।

তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ধরা যাক- খাদ্যে বা পানীয় দ্রব্যে ভেজাল মেশানো। এ কাজটি কি গরীবরা করতে পারবে? মোটেই না। এটা বড় লোকদের ব্যবসার বিষয়। খাদ্যে বা পানিতে ভেজাল মেশালে নানা রোগ হতে পারে। মানুষের মৃত্যুও হতে পারে। কিন্তু খাদ্যে বা পানীয় দ্রব্যে ভেজাল মেশালে শাস্তি কি? দন্ডবিধির ২৭২ ধারা অনুযায়ী এমন অপরাধের শাস্তি মাত্র ৬ মাসের কারাদন্ড, ১ হাজার টাকা অর্থদন্ড।

এসব ক্ষতিকর খাদ্য বিক্রয় করলেও একই শাস্তি। তাহলে বড় লোকরা তাদের অধিক মুনাফার জন্য খাদ্যে বা পানীয় দ্রব্যে ভেজাল মেশাবে না তো কি করবে। ঔষধ কোম্পানীর মালিক কি গরীব প্রকৃতির? তাদের জন্য কি আইন করা হয়েছে দেখুন। যদি কোনো ঔষধ কোম্পানী, ভেষজ পদার্থ প্রস্তুতকারক কোম্পানী ঔষধে বা ভেষজ পদার্থে এমনভাবে ভেজাল মেশায় যাতে ঔষধের কার্যকারিতা হ্রাস পায়, ক্ষেত্র বিশেষে ওই ঔষধে যে কাজ করার কথা তা না করে বা পাল্টা রিএ্যাকশন হয় তাহলে ওই কোম্পানী বা ব্যক্তির জন্য দন্ডবিধির ২৭৪ ধারার বিধান মোতাবেক মাত্র ৬ মাসের সাজার বিধান রয়েছে। এখন তো আমরা দেখি বিষেও বিষ নেই।

ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হরহামেশা হয়। আপনি একটি ভেষজ পদার্থ ব্যবহার করলেন দেখা গেল আপনার চামড়া চুলে গেছে, পুড়ে গেছে, কালছে দাগ তৈরী হয়েছে, ইত্যাদি। হাজারো মানুষের ক্ষতি হলেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ মালিক বা ব্যক্তিকে আইন সুরক্ষা দিয়েছে। আরও ভয়াবহ তথ্য হচ্ছে- কোনো কোম্পানী কোনো একটি ঔষধ বা ভেষজ পদার্থ তৈরী করল একটি বিশেষ রোগের জন্য, কিন্তু ভুলক্রমে প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় অন্য কোনো ঔষধের কাচামাল দিয়ে দিল। প্রচার করল যে, এই ঔষধটি এই রোগের, কিন্তু কার্যত অন্য রোগের।

এমন ভয়াবহ অপরাধের জন্যও মালিক পক্ষের জন্য দন্ডবিধির ২৭৬ ধারায় মাত্র ৬ মাসের সাজার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আবহাওয়াকে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো গরীব লোকেরা করতে পারবে? আগে খোলা লেন্ট্রিন ছিল, এখন তাও নেই। আবহাওয়াকে সবচেয়ে বেশি দুষিত করতে পারে বড় লোকদের কোম্পানী/ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ওলিপুর শিল্প এলাকায় যান, তাহলে বুঝতে পারবেন। বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহারে এলাকায় থাকা দায়, রাজপথে গাড়িতে যাওয়া কষ্টকর। নাকে মুখে হাত চেপে এলাকা পার হতে হয়। মাছের খাবার বা মুরগীর খাবারে এমন সব পদার্থ ব্যবহার করা হয় যার দুর্গন্ধ প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে। কিন্তু এমন বড়লোকদের জন্য জেলের কোনো ব্যবস্থাই রাখা হয়নি।

দন্ডবিধির ২৭৮ ধারায় তাদের জন্য রয়েছে মাত্র পাচশত টাকা অর্থদন্ড। আমরা হাসব না কাঁদব? জাহাজের মালিকরা গরীব? দেখেন তাদেরকে কতটুকু সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। জাহাজে জায়গা নেই, এমনিতেই অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল, তারপরও যদি আরও অতিরিক্ত যাত্রী জাহাজে তুলা হয়, অতিরিক্ত যাত্রী তুলার কারণে যদি যাত্রীদের জীবন বিপন্ন হয় তাহলে জাহাজ মালিকের ২৮২ ধারার বিধান মোতাবেক সাজা হচ্ছে ৬ মাসের কারাদন্ড। আমরা প্রায়ই দেখি কোম্পানী গুলোর কেমিক্যালের বর্জ্য নদী বা জলাশয়ে গিয়ে পড়ায় নদীর পানি দুষিত হচ্ছে, হাস মুরগী মারা যাচ্ছে, মাছ উৎপাদন হচ্ছে না, গরু ছাগল সেই নদীর পানি পান করতে পারছে না, কৃষক কৃষানীরা নদীর পানি ব্যবহার করে গৃহস্থলীর কাজ করতে পারছে না।

কিন্তু এমন অপরাধের জন্য সাজা কি? সাজা হচ্ছে তিন মাসের কারাদন্ড। যদি কোনো নাবিক বেপরোয়াভাবে বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে জাহাজ চালায় তার জন্যও একই সাজা। নিজে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে জাহাজ চালালে কিংবা জাহাজে অতিরিক্ত যাত্রী তুললে ৬ মাসের কারাদন্ড কিন্তু কেউ যদি রাতের বেলায় বাতি জালিয়ে জাহাজকে বিপথগামী করে তাহলে ওই ব্যক্তির সাজা হবে ৭ বছর। জাহাজের মালিক বড় লোক, নাবিক বড় লোক, তাদের অপরাধের জন্য ৬ মাস জেল, যে খামখেয়ালী করে একটি বাতি প্রদর্শন করে জাহাজকে বিপথগামী করল, (বাতি প্রদর্শণ করলেই বিপথগামী হতে হবে কেন ?) সে নিশ্চয় বড় লোক নয়, তার জন্য ৭ বছরের কারাদন্ড।

বিস্ফোরক দ্রব্য, দাহ্য বস্তু তৈরীকারকরা নিশ্চয়ই গরীব শ্রেণীর নন। বিস্ফোরক দ্রবী, দাহ্য বস্তু নিয়ে যদি কেউ অবহেলা করে যাতে মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে এসব অপরাধের শাস্তি ৬ মাসের কারাদন্ড। (২৮৫/২৮৬ ধারা)। দালান কোটার মালিকগন সমাজের উপরের শ্রেণীর মানুষ। অনেক মেয়াদ উত্তীর্ণ দালান ভাংতে হয়, মেরামত করতে হয়, গড়তে হয়। এসব কাজে অবহেলার কারণে কারও কোনো ক্ষতি হলে, উপরের ইট পড়ে মানুষের জানমালের ক্ষতি হলে, সাজা ৬ মাসের জেল। টু নাইনটি বা ২৯০ ধারা।

দন্ডবিধির উক্ত ধারাটি মোটামুটি সবাই জানে। যেমন প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে মেয়ে একে অপরের সম্মতিতে বিবাহ বহির্ভূতভাবে একত্রে রাত্রি যাপন করল বা মেলামেশা করল, তারা আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক হলে, যদি একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ না করে তাহলে এমন অপরাধকে বলা হয় গণ-উপদ্রুব। শাস্তি মাত্র ২শ টাকা জরিমানা। কোনো কারাবাস নেই। বৃটিশরা এমন অপরাধের সাথে অভ্যস্থ ছিল।

ফলে তাদের অপরাধকে ধামাচাপা দিতেই উক্ত আইনকে সহজতর করা হয়েছে। আমরা সবাই জানি, জুয়া খেলা একটি মারাত্বক সামাজিক ও ধর্মীয় অপরাধ। বৃটিশ ধনীক শ্রেণীর মানুষগুলো জুয়া খেলায় অভ্যস্থ ছিল। এখন যদিও আমাদের সমাজের নিম্ন বিত্তরা জুয়া খেলায় আসক্ত হয়েছে, জুয়া খেলা মূলত বড় লোকদের কাজ। জুয়া খেলার মতো গুরুতর অপরাধ করলে আপনাকে ২শ টাকা অর্থদন্ড দিলেই হবে।

যদি আপনি জুয়া খেলার জন্য ক্রিড়া ভবনে হাজির হন তাহলে সাজা আরও কম, মাত্র ১শ টাকা। আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্য, উপরে যেসব অপরাধ এবং শাস্তির কথা বলা হয়েছে সবগুলো অপরাধ জামিনযোগ্য। আদালতে এসে জামিন চাইলে জামিন পাওয়া তার আইনগত অধিকার। আর যে সাজার কথা বলা হয়েছে তা প্রমান করতে হলে রাষ্ট্র বা বাদীকে অনেক কাঠকড় পুড়াতে হবে।

লেখক

এম এ মজিদ
আইনজীবী ও সংবাদকর্মী
হবিগঞ্জ।
০১৭১১-৭৮২২৩২

সামাজিক মিডিয়ায় শেয়ার করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো খবর
Developer By Zorex Zira

Designed by: Sylhet Host BD