
সংবিধান সংস্কার বনাম সংবিধান সংশোধন, এই দুই ইস্যুতে অনড় অবস্থানে রয়েছে সরকারি ও বিরোধী দল। সংসদের প্রথম অধিবেশনে এই ইস্যু নিয়ে দুই শিবিরে পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি-তর্কও হয়েছে। কিন্তু নিজেদের দাবির পক্ষের অবস্থান থেকে সরেননি কেউই। বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তারা সংবিধান সংস্কার চায়। অন্য দিকে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে সরকারি দল বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, সংশোধনের মধ্যেই সংবিধানের সংস্কার রয়েছে।
সূত্র মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তীতে ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ অনুষ্ঠানে পরপর দু’টি শপথ নেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনে জয়ী দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এমপিরা। একটি সংসদ সদস্য ও অন্যটি ছিল ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি’র সদস্য হিসেবে। তবে বিএনপি এমপিরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার কমিটির সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। পরবর্তীতে এই ইস্যুটি নানান আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।
সূত্র মতে, জুলাই আন্দোলনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার বিভিন্ন খাতের সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর গত বছরের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ সই করা হয়। এই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি ছিল সরাসরি সংবিধান সংক্রান্ত। এর মধ্যে ৩০টি প্রস্তাবের বিষয়ে একমত হয়েছিল বিএনপি। আর কয়েকটি প্রস্তাবে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) জানিয়েই শেষ পর্যন্ত অন্য দলগুলোর সাথে ঐক্যে যায় দলটি। সনদটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। এর পরপরই জনগণের সম্মতি যাচাইয়ের জন্য ২৫ নভেম্বর জারি হয় ‘গণভোট অধ্যাদেশ’। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই সনদে বলা হয়, নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি এই পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করবেন। যার শেষ সময়সীমা ছিল গত ১৫ মার্চ। সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করার কথা।
এ নিয়ে গত ৩১ মার্চ বিরোধীদলীয় নেতার আনা একটি মুলতবি প্রস্তাবে সংসদে আলোচনা হয়েছিল। সেদিনও সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। সেদিন এ প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি বিরোধী দল। অন্য দিকে গত ২৯ এপ্রিল সংসদে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এ নিয়ে ১৭ সদস্যের ‘সংশোধন কমিটি’ গঠন করার কথা বলেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তাদের ধারণাগত ভিন্নতা আছে। তাই প্রস্তাবটি নিজেরা আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন। এরই মধ্যে জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পক্ষে রাজপথে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একাধিকবার বলেছেন, জুলাই সনদের প্রতিটি পর্ব অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করবেন। তারপরও বিরোধী দল অহেতুক ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়। আমরা সংবিধানের বাইরে কোনো দাবির পক্ষে নই।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, বিদ্যমান আইন ও সংবিধান অক্ষুণœ রেখে জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট ধারণ সম্ভব নয় বলেই সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি সামনে এসেছে। যে কাঠামোগত পরিবর্তনগুলো প্রয়োজন এই অবস্থায় যদি আগের জায়গায় ফিরে যায় তাহলে পরিবর্তনের যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে সেটি বাস্তবায়ন হবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংবিধান সংস্কার কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে, সেগুলো কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিশ্চিত নয়। তবে তা ঠিক করবে সরকার এবং রাজনৈতিক দলগুলো। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে এই সঙ্কট চরম আকার ধারণ করতে পারে।
গত ৩১ মার্চে সংসদে আলোচনায় সরকারি দলের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়। বিএনপি এই সংস্কার পরিষদ বা সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ৩১ মার্চের আলোচনায় বলেছেন, এই আদেশ আসলে ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল’। তিনি আরো জানান, ১৩৩টা অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ আনা হয়নি। কারণ এটা না অধ্যাদেশ, না আইন। তার মতে, কোনো আদেশের মাধ্যমে এই সার্বভৌম সংসদকে ১৮০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে বাধ্য করা যায় না।
জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের দাবি, জুলাই সনদের ৪৮টি প্রস্তাবের ওপর জনগণ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে রায় দিয়েছে। গণভোটে ৭০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ এসেছে, এটাকে অস্বীকার করলে সংসদ নিজেকে অসম্মান করবে। অতীতে ১৯৭৭, এরশাদ আমল আর ১৯৯১-এও গণভোট হয়েছে, সংবিধানে না থাকলেও কার্যকর হয়েছে। বিএনপি নিজেরাই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে ছিল, নির্বাচন আর গণভোট একদিনে করার দাবি করেছিল। এখন অসাংবিধানিক বললে স্ববিরোধিতা হয়।
এদিকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে সংবিধানের ৩৫টি সংস্কার করা হবে বলে নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি। এখন সংবিধান সংস্কার নয় সংশোধন করা হবে বলে বলছে দলটি। বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়া নির্বাচনী ইশতেহারের প্রথম প্রতিশ্রুতি হলো, সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে বিগত ১৭ অক্টোবর ২০২৫ ইং তারিখে জুলাই জাতীয় সনদ যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সে মতে বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এ ছাড়াও রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে ৩১ দফার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার সাধন করা হবে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের সামনে তিনটি পথ রয়েছে- নতুন সংবিধান প্রণয়ন, সংবিধান স্থগিত রেখে নতুন ব্যবস্থা চালু করা, অথবা বিদ্যমান সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার করা। আমরা তৃতীয় পথেই এগোচ্ছি, অর্থাৎ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে চাই। এ ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মূল উদ্দেশ্যের কোনো বড় পার্থক্য আমি দেখি না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গণভোটের রায় বাস্তবায়ন বিতর্ক যে সামনে আসবে, সেটা অজানা ছিল না। রাজনৈতিক দৃষ্টিতে যাচাই না করা, রাজনৈতিক মতৈক্যের অভাব, ঐকমত্য কমিশনের উচ্চাভিলাষ ও নিরপেক্ষতার অভাবে গণভোট বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জে পড়েছে। ফলে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্কট থেকে উত্তরণ করতে গিয়ে জাতি নতুন সঙ্কটে নিমজ্জিত হয়েছে।
জানতে চাইলে নোয়াখালী-১ আসন থেকে বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন নয়া দিগন্তকে বলেন, সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের মধ্যে আমি মৌলিক কোনো পার্থক্য দেখি না। সংস্কার করতে হলে সেখানেও সংশোধনের বিষয়টি আসবে। এটা একটি জেদাজেদির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের চিন্তা চেতনায় পরিবর্তন আনতে হবে।
সার্বিক বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওযার নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপি তাদের ৩১ দফার প্রথম দফাতেই সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার করেছে। এখন সেটিকে বাদ দিয়ে সংশোধনের কথা বলছে। সংস্কার আর সংশোধনে বিশাল ফারাক। সংশোধন হচ্ছে বক্তব্যের কিছু লাইন বা শব্দের যোগ বিয়োগ, কিছু কারেকশন। কিন্তু সংস্কার হলো সংবিধানের কাঠামোগত বিষয়ের মৌলিক পরিবর্তন। যে বিষয়গুলোর সংস্কারে গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ রায় দিয়েছে। তিনি বলেন, সরকারকে সংবিধান সংস্কারের দিকেই যেতে হবে। অন্যথায় সঙ্কট আরো বাড়বে এবং এর সমাধানে বিরোধীরা জনরায় বাস্তবায়নে রাজপথে থাকবে।
Designed by: Sylhet Host BD
Leave a Reply