
বাঙালির ইতিহাসে যে ক’জন মহামানব তাঁদের চিন্তা, কর্ম ও আদর্শ দিয়ে যুগকে অতিক্রম করেছেন, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তাঁদের অন্যতম। নারীশিক্ষা, নারীঅধিকার ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা শুধু পথপ্রদর্শকই নয় এখনও আমাদের ভাবনার দিশারি।
১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামে জন্ম নেওয়া রোকেয়া এমন এক সমাজে বেড়ে উঠেছিলেন, যেখানে নারীর জন্য আকাশ খুলে ছিল না। পর্দার আড়ালে বন্দী নারীজীবন, শিক্ষার দরজা প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ এই বাস্তবতাকে অতিক্রম করেই রোকেয়া নিজের পথে হাঁটতে শুরু করেন। তাঁর বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের ও স্বামী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সমর্থনে তিনি লেখাপড়া শিখলেন। কিন্তু এখানেই তাঁর যাত্রার গন্তব্য ছিল না তিনি চাইলেন আরও বহু নারী যেন তাঁর মতো আলো দেখতে পারে।
১৯১৬ সালে কলকাতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ যা আজও রোকেয়ার চেতনার উজ্জ্বল স্মারক। সেই সময়ে নারীদের বিদ্যালয়ে পাঠানো ছিল বিরল সাহসের কাজ, আর সেই বাধা ডিঙিয়ে তিনি নারীশিক্ষার যে দরজা খুলে দিলেন, তা আজকের বাংলাদেশের অগণিত নারীকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়।
রোকেয়ার লেখনী ছিল ধারালো যুক্তিনিষ্ঠ। তাঁর গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস নারীর আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার নির্ভীক ঘোষণা। তাঁর লেখা ‘সুলতানার স্বপ্ন’, ‘অবরোধবাসিনী’, ‘পদ্মরাগ’, ‘মতিচুর’ আজও নারীমুক্তি সাহিত্যর ক্লাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তিনি বিশ্বাস করতেন সমাজের অগ্রগতি অসম্ভব, যদি অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত রাখা হয়।
রোকেয়া শুধু একজন লেখক বা শিক্ষাবিদ ছিলেন না তিনি ছিলেন এক অগ্নিমুখী মানসিকতার সংগ্রামী নারী। মুসলিম সমাজে নারীজাগরণ নিয়ে যে সাহসী আন্দোলন তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তা তখনকার রক্ষণশীল সমাজকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। কিন্তু তীব্র বিরোধিতা তাঁকে দমাতে পারেনি বরং প্রতিটি বাধাই তাঁর অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করেছে।
১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর নিজ জন্মদিনেই বেগম রোকেয়া পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তাঁর রেখে যাওয়া আলোকবর্তিকা আজ আরও উজ্জ্বল। নারীশিক্ষার সম্প্রসারণ, নারীর অধিকার সচেতনতা, সমঅধিকারের প্রশ্ন সবকিছুতেই রোকেয়া আজও সামনে থেকে পথ দেখান।
আজকের বাংলাদেশে নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন যতদূর এগিয়েছে, তার সূচনাবিন্দুতে রয়েছেন বেগম রোকেয়া। তাঁর স্বপ্ন, তাঁর সংগ্রাম ও তাঁর জ্ঞানচর্চা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সমাজ নারীর মর্যাদা রক্ষা করে, সেই সমাজই সত্যিকারের অগ্রসর।
রোকেয়া দিবস আসলেই শুধু শ্রদ্ধা জানানোই নয়, তাঁর আদর্শকে বাস্তবায়ন করাই আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত। কারণ বেগম রোকেয়া কেবল একটি নাম নয় তিনি বাঙালি নারীজাগরণের এক অনির্বাণ শিখা।
Designed by: Sylhet Host BD
Leave a Reply