শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন নয়

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মানুষের জনসভায় ‘সঙ্ঘাতের বদলে ঐক্যে’র আহ্বান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, আগামী নির্বাচন হতে হবে একটি নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে। দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না, শেখ হাসিনার অধীনে তো নয়ই।
বিএনপিপ্রধান বলেন, দেশের জনগণ পরিবর্তন চায়। এ পরিবর্তন আসতে হবে নির্বাচন ও ভোটের মাধ্যমে, যে নির্বাচনে জনগণ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবে, ভোট দেবে। এ জন্য প্রয়োজন নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। শেখ হাসিনার অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না, হবে না।
নির্দলীয় সরকারের এ দাবি তুলে ধরার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকেও সরকারের অন্যায় আদেশ না মানার আহ্বান জানান বিএনপি চেয়ারপারসন। তিনি বলেন, একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করার দায়িত্ব আপনাদের। আপনারা সরকারের কথা শুনতে পারেন কিন্তু তাদের অন্যায় আদেশ মানতে পারেন না। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ইভিএম বাতিল করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী নিয়োগ করতে হবে।
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন ও ঐক্যের রাজনীতি করতে চাই। আলাপ-আলোচনা ছাড়া কোনোভাবেই এ পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। সংসদে থাকুক আর বাইরে থাকুক সবার সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি করব না। ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের প্রতি প্রতিহিংসা নয়, তাদের শুদ্ধ করবো।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলে গতকাল এ জনসভার আয়োজন করে বিএনপি। বেলা ২টায় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল আউয়াল খানের কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে জনসভার কার্যক্রম শুরু হয়। জনসভায় ঢাকা মহানগর দণি ও উত্তরের নেতাকর্মী-সমর্থকেরা মিছিল নিয়ে জনসভাস্থলে আসেন। নানামুখী বাধা সত্ত্বেও ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও হাজারো নেতাকর্মী সমাবেশে উপস্থিত হন। বেলা ৩টার মধ্যেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঠ ও এর চার পাশ লোকে-লোকারণ্য হয়ে যায়। কোথাও তিল পরিমাণ জায়গা ফাঁকা ছিল না। জনসভা রূপ নেয় জনসমুদ্রে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মূল ফটকের সামনে, মৎস্যভবন থেকে শাহবাগ সড়কেও জনস্রোত গিয়ে পৌঁছায়।
খালেদা জিয়া মঞ্চে ওঠেন বেলা সাড়ে ৩টায়। মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে মঞ্চে ওঠেন অফ হোয়াইট রঙের শাড়ি পরিহিতা বিএনপি চেয়ারপারসন। হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের অভিবাদনের জবাব দেন তিনি। ৫১ মিনিট স্থায়ী বক্তব্যে খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন, সরকারের দুর্নীতি-অপশাসন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগ, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।
প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ প্রসঙ্গ : প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে চাপ দিয়ে পদত্যাগ করানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, আজকে বিচার বিভাগের কী অবস্থা আপনারা দেখেছেন। প্রধান বিচারপতিকে পর্যন্ত জোর করে অসুস্থ বানিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। দেশের বাইরে পাঠিয়ে শুধু নয়, দেশের বাইরে এজেন্সির লোক পাঠিয়ে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তিনি চেয়েছিলেন দেশে ফিরে আসতে। কিন্তু তাকে দেশে ফিরতে দেয়া হয়নি। তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি কিছু সত্য কথা বলেছেন বলে তার ওপর সরকারের এমন আচরণ উল্লেখ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতি বলেছিলেনÑ নি¤œ আদালত নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার, আবার জুডিশিয়ারির দিকেও তারা হাত বাড়াচ্ছে, একে নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে। তা হলে মানুষ ন্যায়বিচার পাবে না। আজকে সেটিই সত্য হলো। কথা বললে যে দোষ হয় তা আজকে প্রমাণিত হলো। তিনি সত্য কথা বলেছিলেন বলে তাকে আজকে বিদায় নিতে হয়েছে।
খালেদা জিয়া বলেন, আজ ঘরে ঘরে কান্না আর আহাজারি। এ সরকারের হাত থেকে মানুষ মুক্তি চায়, পরিবর্তন চায়। এ সময় তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা কি শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে পারবেন, ভোট দিতে পারবেন। তখন উপস্থিতি নেতাকর্মীরা হাত তুলে সমস্বরে বলেন, ‘না’।
শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন নয় : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না, মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘তারা জনগণকে ভয় পায়। তাই জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে চাই। সবাই যাতে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের ভোট নিজেরা দিতে পারেন সে জন্যই আমরা নির্বাচন কমিশনে আমাদের বক্তব্য ইসির সংস্কারের জন্য দিয়ে এসেছি। বলেছি যদি নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করতে হয় তাহলে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। আজকে নির্বাচন কমিশন কেন বলে সেনা মোতায়েন হবে না, ইভিএম হবে। সরকার যা বলে তাই তারা করবে।
উপস্থিত নেতাকর্মীদের কাছে তিনি জিজ্ঞেস করেন, হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে? আপনারা ভোট দিতে পারবেন? এ সময় উপস্থিত মানুষ সমস্বরে ‘না’ বলেন। বেগম জিয়া বলেন, তারা সবাইকে বের করে দিয়ে একচেটিয়া ভোট নেবে।
সিইসির উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, আপনি সরকারের অন্যায় আবদার মানতে পারেন না। নির্বাচন কমিশনারদের বলতে চাই অবাধ নির্বাচন করার দায়িত্ব আপনাদের। ইভিএম বন্ধ করতে হবে। সেনা মোতায়েন করতে হবে। নির্দলীয় সরকারের ব্যবস্থা করতে হবে। পুলিশ বাহিনীও থাকবে, এতে আমার কেন আপত্তি নেই। হাসিনার গুণ্ডাবাহিনীর হাতে অবৈধ অস্ত্র। তারা মানুষকে খুন করছে। সেনা না দিলে হাসিনার গুণ্ডাবাহিনী কেন্দ্র দখল করে অত্যাচার চালাবে। এ দেশের মানুষ ভোট দেয়ার সুযোগ পেলে পরিবর্তনের জন্য ধানের শীষে ভোট দিয়ে দেখিয়ে দেবেন যে জিয়াকে তারা ভোলেননি। তিনি আছেন মানুষের মনে।
ক্ষমা করে দিয়েছি : তিনি বলেন, আমি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। কিন্তু জনগণ সেটি মানতে রাজি নয়। কারণ এরা কত অবিচার করেছে তা তারা জানে। তার পরও দেশের স্বার্থে আমি তাদের ক্ষমা করব। কারণ আমরা রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে চাই। জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি করতে চাই। আলাপ-আলোচনা ছাড়া তা সম্ভব নয়। আমরা জবাবদিহিতামূলক সংসদ দেখতে চাই, যেখানে কোনো সমস্যা হলে সরকারি দল ও বিরোধী দল মিলে আলোচনা করে তা সমাধান করবে।
আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ করেন খালেদা জিয়া বলেন, দেশের অনেক ক্ষতি করেছেন, সম্পদ লুট করেছেন। পিঠ বাঁচানোর জন্য ক্ষমতায় থাকতে হবে বলে যা ভাবছেন, তা হবে না। আমরা সহিংসতার রাজনীতি করি না। আমরা আপনাদের শুদ্ধ করব। যে খারাপ কাজ করছেন তা বাদ দিয়ে আপনাদের সত্যিকার অর্থে মানুষ বানাব।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা কি জনগণের পালস বোঝেন যে তারা কী চাচ্ছে? জনগণ চাচ্ছে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন। কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে না। হাসিনার অধীনে নির্বাচন হবে না। নির্বাচন দিয়ে আপনাদের জনপ্রিয়তা যাচাই করুন।
আওয়ামী লীগকে চ্যালেঞ্জ : চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, মাঠে আপনারাও যাবেন, আমরাও যাবো। চ্যালেঞ্জ করছি একটি জায়গায় আপনারা সভা করেন আমরাও করছি, দেখি কাদের কত লোক আছে। জনগণই আমাদের শক্তি। তাদের নিয়ে আমাদের পথচলা। আমরা এটা বিশ্বাস করি।
তিনি বলেন, আমি কেন বলছি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা। এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছিল আওয়ামী লীগের ও জামায়াতের। তারা এ জন্য ১৭৩ দিন হরতাল করেছে। রাস্তাঘাট বন্ধ রেখেছে। হরতালের নামে অরাজকতা সৃষ্টি করেছে। এমনকি ইট দিয়ে পুলিশের মাথা থেতলে দিয়েছে। অফিসগামী বয়স্ক লোকদের তারা দিগম্বর করেছে। এগুলো আওয়ামী লীগের চরিত্র। তারা তত্ত্বাবধায়কের দাবির জন্য সমুদ্রবন্দর দিনের পর দিন বন্ধ রেখেছে।
তিনি বলেন, বাসে আগুন দেয় আওয়ামী লীগ। যাত্রীবাহী বাসে গান পাউডার দিয়ে আগুন দিয়ে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে তারা। এদের অপকীর্তির শেষ নেই। তাই আপনাদের বলব নিরপেক্ষ একটা নির্বাচন দিয়ে দেশের মানুষ কী চায় সেটা যাচাই করুন।
খালেদা জিয়া বলেন, ২০১৪ সালে কোনো নির্বাচন হয়নি। তাহলে কী করে এই সরকার বৈধ সরকার হয়। সরকার ও সংসদ দুটোই অবৈধ। এই সংসদে কোনো বিরোধী দল আছে? এ সময় সমস্বরে সবাই বলেনÑ না।
খালেদা জিয়া সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, এই সরকার হয়তো আপনাদের বলে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আপনাদের চাকরি যাবে, মামলা হয়রানির শিকার হতে হবে। কিন্তু না, আমরা আগেই বলেছি আমরা হিংসাত্মক রাজনীতি করি না। সরকারি আদেশ-নিষেধ মেনে চলাই আপনাদের দায়িত্ব। আমরা দেখব সরকারি চাকরিতে কে কতটা যোগ্য। সেখানে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ বলতে কিছু নেই। যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে তাদের চাকরিতে পদোন্নতি হবে। আপনারা নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন।
সমাবেশে বাধা দেয়ার অভিযোগ করে তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর আমরা সমাবেশ করতে চেয়েছিলাম, তারা দেয়নি। জনসভার অনুমতি তারা দিয়েছে কিন্তু জনসভা যাতে সফল না হয়, জনগণ যাতে আসতে না পারে, সে জন্য বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষকে অনেক কষ্ট করে আসতে হয়েছে। বাড়ি বাড়ি ও হোটেলগুলোতে তল্লাশি করেছে। পাবলিক যানবাহন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এমনকি আমিও যাতে আপনাদের সামনে এসে পৌঁছাতে না পারি সে জন্য আমার বাসা থেকে বের হয়ে গুলশান পার হতে বাস দিয়ে রাস্তা আটকে রাখা হয়েছে। এরা যে কত ছোট মনের রাজনীতি করে, তা আবার প্রমাণ করল। এত ছোট মন নিয়ে রাজনীতি করা যায় না।
খালেদা জিয়া বলেন, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনতে ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা কাজ করেছে। এ জন্য আওয়ামী লীগ এই দিনকে ভয় পায়। জনগণকে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে ভয় পায়। সে জন্যই তারা আমাদেরকে কোথাও জনসভা করতে দেয় না। বিভিন্ন জায়গায় হয়রানি করছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলখানায় বন্দী করছে।
তিনি বলেন, আমাদের রাজনীতি হলো জাতীয় ঐক্যের। বহুদলীয় গণতন্ত্র ও মতের পার্থক্য থাকবে কিন্তু জনগণের স্বার্থে এক হতে হবে। তা হলেই দেশের ও জনগণের কল্যাণে উন্নতি করা সম্ভব। এরা ক্ষমতায় থেকে জনগণকে যেমন ভয় পাচ্ছে, তেমনি বিএনপির মতো বড় দলকেও ভয় পায়। বিএনপি সম্পর্কে তারা বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করে। আমরা মন্তব্য করলে তাদের ধরে নিয়ে মিথ্যা মামলায় হয়রানি করে। এরা গণতন্ত্রকে ভয় পায়, মানুষকে ভয় পায়। সে জন্য বাকশাল কায়েম করেছিল। এখন অঘোষিতভাবে বাকশালকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তিনি বলেন, সরকার জনগণের কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়েছে। যারাই এ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলবে, হয় তাদের উঠিয়ে নেবে, না হয় মামলা দিয়ে হয়রানি করা হবে। ১০টি বছর ধরে কত জুলুম-অত্যাচার করেছে তার হিসাব নেই।
তিনি বলেন, আমি বলেছি তাদের ক্ষমা করে দেবো। কিন্তু জনগণ জানে কত অবিচার তাদের সঙ্গে করেছে। আমরা দেশে রাজনীতির সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চাই। সে জন্য দেশে গণতন্ত্র প্রয়োজন, বহু মতের মানুষকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যতক্ষণ এগুলো প্রতিষ্ঠা করা না যাবে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা যাবে না।
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ সরকার দেশকে শেষ করে দিয়েছে। ১০ টাকার চাল আজ ৭০ টাকা। সবজি তরিতরকারির দাম ৭০-৮০ টাকার নিচে নেই। পেঁয়াজ ১০০ টাকা। এ অবস্থায় আবার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। বিনা মূল্যে সার তো দেয়-ই না, বরং বিএনপির আমলের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। কৃষকেরা আজ মহাদুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন, তারা কৃষি উপকরণ পাচ্ছেন না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার কথা বলেছে, কিন্তু চাকরি দেয়নি। চাকরি না দিয়ে ঘরে ঘরে বেকার সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, এরা কথায় কথায় উন্নয়নের কথা বলে। উন্নয়নের নামে লুটপাট চলছে। ইউরোপ, আমেরিকার চেয়ে রাস্তা-ব্রিজ বানানোর জন্য চার গুণ বেশি ব্যয় হচ্ছে। চলছে নানা রকম ধাপ্পাবাজি। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে, কিন্তু মানুষ বিদ্যুৎ পায় না। গুলশানের মতো জায়গায়ও বিদ্যুৎ আসে-যায়। কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট করা হলো। তা হলে মানুষ বিদ্যুৎ পায় না কেন? পদে পদে ধোঁকাবাজি। দীর্ঘ দিন ধরে এই ধোঁকাবাজি অত্যাচার-নির্যাতন চলতে পারে না।
বিএনপি চেয়ারপারসন তার দেয়া ‘ভিশন-২০৩০’ রূপকল্প তুলে ধরে দেশের বেকারত্ব দূর করতে বেকারভাতা চালু, স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক শিা, নারীদের উপবৃত্তি প্রদান, সব নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ও পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্যবীমা চালুসহ নানা অঙ্গীকারের কথাও বলেন।
শেয়ারবাজার ধসের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আওয়ামী লীগ এলেই শেয়ারবাজার লুট হয়। এর আগে কখনো শুনিনি সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের মানুষের টাকা আছে। আওয়ামী লীগ আসার পর ওই ব্যাংকে টাকা পাঠিয়েছে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিরা। মানুষের রক্ত চুষে টাকা চুরি করে বিদেশে পাঠিয়েছে। ২০১৫ সালে পাঁচ হাজার কোটি ও গত ১০ বছরে সুইস ব্যাংকে সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার বেশি পাচার হয়েছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ প্রতি পদে পদে দুর্নীতি করছে। এই কেলেঙ্কারি নিয়ে দুদক কোনো মামলা বা কোনো তদন্ত করেনি। অথচ দুদক পড়ে আছে আমাদের পেছনে। যার সাথে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, তার পেছনে লেগে আছে।
তিনি আরো বলেন, গত সাত বছরে ব্যাংক থেকে চুরি হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা ৮০০ কোটি টাকা কারসাজি করে পাচার করা হয়েছে। কিন্তু এগুলো নিয়ে কোনো তদন্ত হয় না। কাউকে ধরা হয়নি। এগুলো তো আওয়ামী লীগের টাকা নয়, জনগণের টাকা। জনগণের টাকা এভাবে পাচার হচ্ছে, অথচ তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এ দেশের মানুষ বাঁচল কী মরল তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই।
রোহিঙ্গা সমস্যা প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, এটি শুধু ভোটারবিহীন সরকারের সমস্যা নয়, এটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। তাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে আমেরিকা, ব্রিটেন, ইন্ডিয়া, চীন ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি আমি আহ্বান জানাচ্ছি। এ জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে অনেক মানুষ মেরে ফেলবে বলে ক্ষমতাসীনদের বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি মানুষ মারার রাজনীতি করে না।
এক-এগারোর সময়ে নির্যাতনের কথা স্মরণ করে খালেদা জিয়া বলেন, সেই সময় আমার ছেলেদের নির্যাতন করেছে। এক ছেলেকে পঙ্গু করেছে। আরেক ছেলে মারা গেল। (এ সময় কিছুটা আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। নিজেকে সামলে আবার বক্তব্য রাখা শুরু করেন বিএনপি প্রধান।) লন্ডন থেকে খালেদা জিয়া আর ফিরবেন নাÑ আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, জনগণই আমার শক্তি। এ দেশেই আমি থাকতে চাই।
দুপুর থেকেই নেতাকর্মীরা জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতিকৃতিসংবলিত পোস্টার হাতে মিছিল নিয়ে সমাবেশস্থলে আসেন। ঢাকা মহানগর উত্তর-দণি ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে নেতাকর্মী-সমর্থকেরা এ জনসভায় যোগ দেন। কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী, বরিশাল থেকে জহিরউদ্দিন স্বপন, গাজীপুর থেকে সায়্যেদুল আলম বাবুল, সিলেট থেকে কাইয়ুম চৌধুরীর নেতৃত্বে নেতাকর্মীরাও জনসভায় যোগ দেন। সমাবেশে অংশ নেয়া যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীদের অনেকের মাথায় ছিল লাল-সবুজের টুপি।
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, রফিকুল ইসলাম মিয়া, জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদ, আবদুল্লাহ আল নোমান, শাহজাহান ওমর, বরকতউল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আহমেদ আজম খান, জয়নাল আবেদীন, শওকত মাহমুদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আমানউল্লাহ আমান, আবুল খায়ের ভুঁইয়া, যুগ্ম মহাসচিব মাহবুবউদ্দিন খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, হারুন অর রশীদ প্রমুখ বক্তব্য দেন।
অন্যান্য নেতাদের বক্তব্য : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আওয়ামী লীগ লুটেরাদের দল। তারা মানুষের ভোট, সম্পদ ও রাজস্ব লুট করেছে। খালেদা জিয়াকে মামলায় হয়রানি করছে। কিন্তু এসবের জবাব জনগণ দেবে। জনতার আদালতে তাদের বিচার হবে। যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে, তাদের বিচার হবে। এ সময় তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা এই স্বৈরাচারী সরকারকে সরাতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিন।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ ৭ নভেম্বরকে ভয় পায়। কারণ তারা বাকশাল কায়েম করে গণতন্ত্র হত্যা করেছে। পরবর্তীতে শহীদ জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আওয়ামী লীগ বাস চলাচল বন্ধ করেও সমাবেশ ভণ্ডুল করতে পারেনি। জনগণ হেঁটেই সমাবেশে অংশ নিয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৮ সাল হবে আওয়ামী লীগের বিদায়ের বছর। এ দেশে শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার ছাড়া শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন চাই না।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব ছিল। সেই দিন জিয়াউর রহমান গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আশা করি আগামী দিনে আমাদেরকে অনুমতি নিয়ে আর সমাবেশ করতে হবে না।
ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে গণতন্ত্র দিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়া তা বহন করছেন। বিএনপি যত দিন ক্ষমতায় ছিল তত দিন গণতন্ত্র ও আইনের শাসন ছিল। কিন্তু আজকে আওয়ামী লীগ সব ধ্বংস করেছে। তারা গুম-খুন শুরু করেছে। আমাদের দক্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। আসুন আমরা আওয়ামী লীগকে সরিয়ে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করি।
মির্জা আব্বাস বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে একতরফা কোনো নির্বাচন হবে না। সমাবেশে জনস্রোত ঠেকাতে সরকার মিছিলে গুলি করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বেগম খালেদা জিয়া মাদার অব ডেমোক্র্যাসি। আমি তাকে অনুরোধ করব গণতন্ত্রের প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না। নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন বাংলাদেশে হবে না। আমরা জীবনবাজি রেখে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করব।
ড. আবদুল মঈন খান বলেন, শহীদ জিয়া বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে ঐক্য তৈরি করেছিলেন। তিনি দেশের ক্রান্তিকালে এগিয়ে এসেছিলেন। আজো দেশে গণতন্ত্রের সঙ্কট। আমরা ঐকবদ্ধভাবে তা পুনরুদ্ধার করব।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, বাংলাদেশ থেকে গণতন্ত্র হারিয়ে গেছে। আমরা বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলন চালিয়ে যাবো। তিনি সবাইকে প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানান।
বিএনপি মহানগর দেিণর সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, মহানগরের নেতা মুন্সি বজলুল বাসিত আনজু, অঙ্গসংগঠনের মধ্যে যুবদলের সাইফুল আলম নিরব, স্বেচ্ছাসেবক দলের শফিউল বারী বাবু, শ্রমিক দলের আনোয়ার হোসাইন, মহিলা দলের সুলতানা আহমেদ, ছাত্রদলের রাজীব আহসান প্রমুখ বক্তব্য দেন।
জনসভা পরিচালনা করেন বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও সহ-প্রচার সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীম।
অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, সিনিয়র নেতা হারুন আল রশীদ, মাহমুদুল হাসান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মীর মো: নাসির উদ্দিন, অধ্যাপক আবদুল মান্নান, রুহুল আলম চৌধুরী, শামসুজ্জামান দুদু, নিতাই রায় চৌধুরী, গিয়াস কাদের চৌধুরী, শওকত মাহমুদ, হাবিবুর রহমান হাবিব, মিজানুর রহমান মিনু, আবদুস সালাম, ভিপি জয়নাল আবেদীন, মো: শাহজাদা মিয়া, ফরহাদ হালিম ডোনার, রুহুল কবির রিজভী, মজিবুর রহমান সারোয়ার, ফজলুল হক মিলন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, মাহবুবে রহমান শামীম, সাখাওয়াত হোসেন জীবন, বিলকিস জাহান শিরিন, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, শামা ওবায়েদ, গৌতম চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, সালাহউদ্দিন আহমেদ, আবদুল হাই, আশরাফউদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল, নুরী আরা সাফা, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, আজিজুল বারী হেলাল, মীর সরফত আলী সপু, শিরিন সুলতানা, ফাওয়াজ হোসেন শুভ, নাজিম উদ্দিন আলম, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, আবদুস সালাম আজাদ, শরীফুল আলম, আবদুল আউয়াল খান, তাইফুল ইসলাম টিপু, মুনির হোসেন, বেলাল আহমেদ, মাহবুবুল হক নান্নু, আমিরুল ইসলাম আলীম, আসাদুল করীম শাহিন, রেহানা আখতার রানু, ভিপি হারুনুর রশীদ, শহীদুল আলম, শামসুল আলম তোহা, কাজী আবুল বাশার, আহসানউল্লাহ হাসান, খন্দকার আবু আশফাক, ড. খন্দকার মারুফ হোসেন, জিয়া পরিষদের চেয়ারম্যান কবির মুরাদ, মহাসচিব ড. এমতাজ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম ও আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ নেতা উপস্থিত ছিলেন।
অঙ্গসংগঠনের নেতাদের মধ্যে যুবদলের সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, মোরতাজুল করীম বাদরু, নুরুল ইসলাম নয়ন, মাহবুবুল হাসান পিঙ্কু, স্বেচ্ছাসেবক দলের আবদুল কাদির ভুইয়া জুয়েল, মুক্তিযোদ্ধা দলের আবুল হোসেন, সাদেক আহমেদ খান, শ্রমিক দলের আনোয়ার হোসাইন, নুরুল ইসলাম খান নাসিম, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, হেলিন জেরিন খান, ছাত্রদলের আকরামুল হাসান, নিলোফার চৌধুরী মনি, শাম্মী আখতার, চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান, শামসুদ্দিন দিদার প্রমুখ ছিলেন।
মহানগরীর নেতাদের মধ্যে আহসান উল্লাহ হাসান, ইউনুছ মৃধা, তানভীর আহমেদ রবিন, চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন রতন, চেয়ারম্যান আতাউর রহমান, মোশারফ হোসেন খোকন, হাবিবুর রশিদ হাবিব, আলী রেজাউর রহমান রিপন, এ জি এম শামসুল হক, কাউন্সিলর আনোয়ার পারভেজ বাদল, এম এ হান্নান, মো: ফরহাদ হোসেন, চেয়ারম্যান বেল্লাল হোসেন, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম কিবরিয়া, মো: ইকবাল হোসেন, হাজী দুলাল, প্রফেসর আনোয়ার হোসেন ও মো: মনির হোসেন চেয়ারম্যান মিছিল নিয়ে সমাবেশে আসেন।
জনসভা উপলে সকাল থেকে পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে জলকামানের গাড়ি ও প্রিজন ভ্যান রাখা হয়।

 

মঈন উদ্দিন খান ও শফিকুল ইসলাম

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *