রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবন, বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রধান সমস্যা

উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বেসরকারি বিভিন্ন সাহায্য সংস্থা ও ব্যক্তি উদ্যেগে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো ও বিতরণের কারণে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের খাবারের সঙ্কট না হলেও সবার কাছে ত্রাণ বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

উখিয়ার বালুখালী, থ্যাংখালী, কুতুপালং, ঘুমধুম, পানখালীসহ বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ঘুরে দেখা গেছে ত্রাণ বিতরণে এখনো বিশৃঙ্খলা রয়েছে। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারি উদ্যোগে খুব সামান্যই ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। অবশ্য আজ সোমবার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণের জন্য ১২টি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ত্রাণ আসছে।

বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণের পরিমাণ কমে গেলে শরণার্থী শিবিরগুলোতে বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করেছেন ত্রাণ বিতরণে সংশ্লিষ্টরা।

টেকনাফ ও উখিয়ার প্রত্যন্ত এলাকা, বিশেষ করে গ্রামে ও পাহাড়ের ঢালে যারা বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করছেন তাদের কাছে খাবার বা তাবু পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে গত শনিবার ও রোববারে বৃষ্টির কারণে আশ্রয়হীন এসব মানুষ মাটিতেও বসে থাকতে পারছেন না। সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বাবা-মা কিংবা অভিভাবকহীন শিশুরা। ইউনিসেফের সর্বশেষ হিসাবে বলা হয়েছেÑ এ পর্যন্ত এক হাজার ৩০০ অভিভাবকহীন শিশু সংস্থাটি চিহ্নিত করতে পেরেছে।

এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা কিছুটা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী তারা লজ্জায় ত্রাণ চাইতেও পারছেন না। আবার অনেক পরিবার রয়েছে যাদের কোনো পুরুষ সদস্য নেই। এসব পরিবারের পক্ষে প্রতিদিন খাবার সংগ্রহ করা দুরূহ হয়ে পড়ছে। ইউএনএইচসিআর, ইউনিসেফ, আইওমের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সুশৃঙ্খলভাবে ত্রাণ ও চিকিৎসা কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছে। অপর দিকে দেশের কয়েকটি সংস্থা যেমন- গণ স্বাস্থ্য, সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্ট ও বিএমএসহ বেশ কয়েকটি সংস্থা কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসা ও ত্রাণ বিতরণ করছে, কিন্তু এ ধরনের সংস্থাগুলো সব শরণার্থী আশ্রয়কেন্দ্রে স্বাস্থ্যসেবা বা ত্রাণ বিতরণের ব্যবস্থা করতে পারেনি। বালুখালী ক্যাম্পে দেখা গেছে, নিজ উদ্যোগে অনেকে ট্রাকে করে ত্রাণ বিতরণ করছেন। এর ফলে অনেকে একাধিক বার খাবার ও ত্রাণের প্যাকেট পেলেও অনেক নারী ও শিশু কিছুই পাচ্ছেন না।

এ ছাড়া শরণার্থী আশ্রয়স্থলগুলোতে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি। আশ্রয়স্থানে পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হয়নি। ত্রাণকর্মীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ত্রাণ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হলে সহজেই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতো। উখিয়ার থ্যাংখালী উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে বিশাল একটি শিবির গড়ে উঠেছে। সরেজমিন দেখা গেছে, বিজিবির কয়েকজন সদস্যের মাধ্যমে এই আশ্রয়কেন্দ্রে কিছুটা সুশৃঙ্খলভাবে ত্রাণ বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে। এখানে সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্টর মাধ্যমে কয়েকটি অস্থায়ী টয়লেট ও টিউবওয়েল বসানোর কারণে খাবার পানির সমস্যার অনেকটা সমাধান করা সম্ভব হয়েছে।

পুরো উখিয়া ও টেকনাফজুড়ে বিচ্ছিন্নভাবে আরো যেসব স্থানে শরণার্থীরা আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের কাছে খাবার যেমন পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না, তেমনি তাদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদের অনেককে বিচ্ছিন্নভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। যার মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছেন।

ব্যক্তি উদ্যোগে যারা ত্রাণ বিতরণ করছেন তারা সঠিক নির্দেশনা না পাওয়ার কারণে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের পাশে যেসব শরণার্থী অবস্থান করছেন তাদের মধ্যে শুধু ত্রাণ বিতরণ করছেন। এদের বেশির ভাগই কুতুপালং শিবিরে থাকা পুরনো শরণার্থী। পরে যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থী এসেছেন তাদের বড় একটি অংশ মূল সড়ক থেকে অনেক দূরের গ্রামগুলোতে থাকছেন। আবার নৌপথে যারা আসছেন তারা টেকনাফের আশপাশে এবং মেরিন ড্রাইভের পাশের এলাকাগুলোতে অবস্থান করছেন, কিন্তু তাদের কাছে ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। বালুখালীতে চিকিৎসাসেবা দানে ব্যস্ত একজন চিকিৎসক জানান শরণার্থীরা এখনো মানসিক আতঙ্কের (ট্রমা) মধ্যে আছেন। জীবন বাঁচাতে পেরেছেন এতেই তারা সন্তুষ্ট, কিন্তু তারা অনেকে উদ্ভান্ত। কারণ, তারা চোখের সামনে বাবা-মা, ভাই-বোনকে গুলি বা গলাকেটে হত্যা করতে দেখেছেন। এসব দৃশ্য তাদের মানসিকভাবে অসুস্থ করে তুলেছে। অনেক নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। লজ্জায় বলতে পারছেন না। এদের অনেকে এক সপ্তাহ বা দুই সপ্তাহের বেশি সময় গোসল করতে পারেননি। ফলে নানা ধরনের চর্ম রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। খাওয়ার পানির ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কয়েকদিন পর যদি ত্রাণ কমে আসে তখন বড় ধরনের সঙ্কটের মধ্যে পড়তে হবে। এর ফলে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণহীন পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তিনি বলেন, শুধু নিবন্ধন নয়; সার্বিকভাবে এখন থেকে শরণার্থীদের শৃঙ্খলার মধ্যে আনার চেষ্টা করা উচিত।

ব্যক্তি উদ্যোগে যারা ত্রাণ বিতরণ করছেন তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, তারা নিজেরাই ত্রাণ দিতে আগ্রহী। জেলা প্রশাসন বা সরকারি উদ্যোগে তারা ত্রাণ দিতে রাজি নন।

গোপালগঞ্জ থেকে কয়েকজন ব্যবসায়ী ১০ লাখ টাকার ত্রাণ নিয়ে ২০ ঘণ্টা বাসে কাটিয়ে কক্সবাজার এসেছেন। এদের একজন ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী বিক্রেতা মোস্তাফিজুর রহমান লাবলু এই প্রতিবেদককে জানান, তারা নিজে গিয়ে ত্রাণ বিতরণ করবেন। সরকারিভাবে ত্রাণ যথাযথভাবে বিতরণ হবে কি না তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।

একইভাবে থ্যাংখালী ক্যাম্পে ত্রাণ বিতরণ করতে এসেছেন লক্ষ্মীপুর মান্দারী বাজারের বায়তুর রহমান জামে মসজিদের খতিব মাওলানা মাকসুদুর রহমান। ক্যাম্পে অবস্থানরত বিজিবির একজন কর্মকর্তার কাছে ত্রাণ দেয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা চাইলে তাকে টিউবওয়েল স্থাপনে সহযোগিতা করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এই শরণার্থী শিবিরে টিওবওয়েল বসানো সম্ভব হয়েছে।

শরণার্থীদের ত্রাণ কার্যক্রমে দু’টি সংস্থাকে সহযোগিতা করছেন উখিয়ার স্থানীয় সাংবাদিক এস এম আনোয়ার হোসেন।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ত্রাণ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হলে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে ও দুর্ভোগ কমবে। এর ফলে ব্যক্তি উদ্যোগে যারা ত্রাণ দিচ্ছেন তাদের মধ্যেও আস্থা ফিরে আসবে।

টেকনাফের বহারছড়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও কমিউনিটি পুলিশের সভাপতি মো: বাহাদুরের মতে সেনাবাহিনী দিয়ে ত্রাণ বিতরণ না করলে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব নয়।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *