বানিয়াচংয়ে ডাকাত পুলিশ বন্দুক যুদ্ধে ডাকাত ঝিলকী নিহত ॥ ৪ পুলিশ আহত ॥ পাইপগান, দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার

বানিয়াচংয়ে ডাকাত-পুলিশ বন্দুকযুদ্ধে ১ ডাকাত নিহত ও ৪ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে গত বৃহস্পতিবার ভোর রাতে বানিয়াচং-শিবপাশা সড়কের আনজইন ব্রীজের পাশে। নিহত ডাকাত সাইফুল ইসলাম ওরফে ঝিলকি (৩২) উপজেলা সদরের মাদারীটুলা গ্রামের মৃত মতিউর রহমানের ছেলে। এ ঘটনায় আহত এসআই ওমর ফারুক মোড়ল, এএসআই হারুন মিয়া ও এএসআই বিশ^জিৎকে বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। তন্মধ্যে এএসআই প্রদীপ কুমার দাশের হাতে ডাকাতদলের ছুড়া গুলি বিদ্ধ হয়েছে। তাকে বানিয়াচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি পাইপগান, ৩ রাউন্ড তাজা গুলি, ৫ রাউন্ড ব্যবহৃত গুলি ও ৪ টি রামদা উদ্ধার করেছে।
যেভাবে অভিযান শুরুঃ বুধবার বিকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বানিয়াচং থানায় খবর আসে দূদর্ষ ডাকাত সাইফুল ইসলাম ওরফে ঝিলকি তার আত্মীয় কাগাপাশা ইউনিয়নের ইছবপুর গ্রামের বাড়ীতে একটি সংঘবদ্ধ ডাকাতদলসহ সেখানে অবস্থান করছে। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর ওসি মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ওই গ্রামে অবস্থান করে সেই বাড়ীটি ঘেরাও করে অভিযান চালালে ডাকাতরা পুলিশকে লক্ষ করে গুলি চালায়। এসময় কৌশলে পালিয়ে যেতে ঝিলকী ও মোস্তুফা নামে দু’ডাকাত পানিতে ঝাপিয়ে দেয়, সাথে সাথে থানার এসআই ওমর ফারুক মোড়ল, মোঃ ফিরোজ আহমেদ, এএসআই প্রদীপ কুমার দাশ, হারুন, বিশ্বজিৎ, দিলোয়ার, কনেস্টেবল ইব্রাহীম, মাইনুলসহ পুলিশ সদস্যরা হাওরের পানিতে ঝাপদিয়ে সাতরিয়ে প্রায় ১ ঘন্টার রৌদ্ধশ্বাস অভিযানে ডাকাত সাইফুল ইসলাম ওরফে ঝিলকী ও মোস্তুফাকে আটক করতে সক্ষম হয়। এরই মধ্যে অভিযানে যোগদেন হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বানিয়াচং সার্কেল) শৈলেন চাকমাসহ বানিয়াচং থানার সকল পুলিশ অফিসারগণ। এদিকে গুলাগুলির সময় গ্রামবাসী আজম মিয়া ও মনু মিয়া নামে আরও দুই ডাকাতকে পাকড়াও করে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করলে আহত অবস্থায় তাদেরকে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঝিলকীকে গ্রেফতারের পর তার দেয়া তথ্য মতে তাকে নিয়ে পুলিশ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সহযোগী ডাকাতদের গ্রেফতার করতে বানিয়াচং শিবপাশা রোডের আঞ্জন নামক এলাকায় অভিযানে যায়। রাত সাড়ে ৩টার দিকে আঞ্জনদিঘীরপার সংলগ্ন ব্রিজের উপর পৌঁছা মাত্র রাস্তার দু’পাশ থেকে তার সহযোগীরা রাস্তায় ব্যারিকেড দেয় এবং ঝিলকীকে ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এসময় রাস্তার দু’পাশের হাওর থেকে ডাকাতরা এলোপাতারি গুলি ছুঁড়তে থাকে। পুলিশও প্রায় ২০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি চালায়। একপর্যায়ে সহযোগী ডাকাতদের গুলিতে ঝিলকী গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে উদ্ধার করে হবিগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বানিয়াচঙ্গের ত্রাস কুখ্যাত ডাকাত ঝিলকীর নামে যত মামলা ঃ পুলিশের দাবি, নিহত সাইফুল ইসলাম ঝিলকী ডাকাত দলের অন্যতম সর্দার। তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা, চারটি ডাকাতি, একটি চুরির ও চারটি দ্রুত বিচার আইনের মামলা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ৮টি গ্রেফতারি পরোয়ানা বানিয়াচং থানায় মুলতবি আছে।
এ বিষয়ে বানিয়াচং থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ মোজাম্মেল হক বাংলা কন্ঠকে জানান, ডাকাত সাইফুল ইসলাম ওরফে ঝিলকী একজন কুখ্যাত ডাকাত ছিল। পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধের সময় ডাকাতদের ছুড়া গুলির আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে। এ অভিযানে আটক অপর ডাকাতদের বিরুদ্ধেও বানিয়াচং থানাসহ আরো বেশ কয়েকটি থানায় ডাকাতি ও চুরির মামলা রয়েছে। এদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আন্ত: ডাকাত দলের সর্দার বহু অপকর্মের হোতা সাইফুল ইসলাম ওরফে ঝিলকি (৩২) পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্থি ফিরে এসেছে । দীর্ঘদিন যাবত এলাকাবাসী ঝিলকির অত্যাচারে অতিষ্ট ছিলেন । সে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজী সহ হেন কোন অপরাধমূলক কর্মকান্ড নেই যা সে করেনি । এলাকাসহ সাধারণ মানুষের কাছে ঝিলকি শুধু দুর্ধর্ষ ডাকাতই নয় সুন্দরবনের বন দস্যুর ন্যায় এক মূর্তিমান আতংক ছিল ।
ঝিলকির উত্থান যেভাবে : এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, বানিয়াচং সদরের মাদারীটুলা গ্রামের মতিউর রহমানের ছেলে সাইফুল ইসলাম ওরফে ঝিলকি। ছোটবেলাই পিতা মতিউর রহমান মারা যান। অনাদর-অবহেলায় কিছুটা বড় হয়ে হবিগঞ্জ-বানিয়াচং রোডের চান্দের গাড়িতে হেলপার হিসেবে শুরু হয় তার পথচলা। বেশ কিছুদিন হেলপার হিসেবে থাকার পর এক পর্যায়ে একই গাড়ির চালক হয়ে যায় সে। এভাবে কিছুদিন চালক হওয়ার পর ক্রমে ক্রমে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে যায় । জনরোষ থেকে বাঁচতে এক সময় চান্দের গাড়িরর ড্রাইভারি একেবারে ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়ে । উঠতি বয়স এবং হালকা-পাতলা হলেও তার দূরন্ত সাহস দিয়ে মানুষকে একে একে কুপোকাত করতে থাকে । এরই মধ্যে তার কু-খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে । মামলার বেড়াজালেও পড়ে যায় বেশ কয়েকবার । দীর্ঘদিন জেল খেটে আরো দুর্ধর্ষ হয়ে উঠে সে । কয়েক বছর পূর্বে বড় বাজার এলাকায় চায়ের স্টলের একটি ছেলেকে প্রকাশ্যে হত্যা করে একেবারে লাইম লাইটে চলে আসে ঝিলকি। দায়ের করা হয় একটি হত্যা মামলা । তার বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ স্বাক্ষী পর্যন্ত দেয় নি। ইতিমধ্যে তার এহেন খারাপ কর্মকান্ডের জন্য পুলিশ প্রশাসন তাকে পাকড়াও করতে মরিয়া হয়ে উঠে । পুলিশের তাড়া খেয়ে প্রায় সময়ই সে বাড়িতে আসতে পারতোনা । বাড়িতে না আসলে ও থেমে নেই তার অপরাধমূলক কর্মকান্ড । নানার বাড়ি পাশর্^বর্তী এলাকা হওয়ায় এবং তারা এলাকায় কিছুটা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পায় ঝিলকি । এলাকার মানুষদের নানান ক্ষেত্রে ভয়ভীতি এবং হয়রানি করলে মামাদের কাছে বিচার প্রার্থী হলেও রহস্যজনক কারণে তারা এর বিচার করেন নি এবং উল্টো তাকে মদদ দিয়েছে তাকে কেউ কেউ । বালিকা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এবং সাগর দীঘির পূর্বপাড়ের বাংলা লিংক টাওয়ারের স্থানে সন্ধার পর হলেই কোন মানুষ একা একা যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তো দুর্ধর্ষ ডাকাত ঝিলকির জন্য । গত এক বছর পূর্বে গ্যানিংগঞ্জ বাজার ফ্লেক্সিলোড ব্যবসায়ী রায়হানকে উপর্যপুরী ছুরিকাঘাত করে বেশ কিছু টাকা এবং মোবাইল ছিনতাই করে নিয়ে যায় ঝিলকি বাহিনী। এ ঘটনায় সাগর দীঘির পশ্চিম পাড় চার মহল্লাবাসী ছান্দের সর্দার প্রিন্সিপাল আব্দাল হোসেন খানের নেতৃত্বে ডাকাত ঝিলকির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন । এ সময় ভয়ে এলাকা ছাড়া হয় সে । এর পর ছান্দের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় ঝিলকি ডাকাতকে কেউ ধরিয়ে দিতে পারলে তাকে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে । এ জন্য বেশ কয়েকবার প্রিন্সিপাল আব্দাল হোসেন খানের উপর হামলার চেষ্টা চালায় ঝিলকী । এলাকার এ জনরোষকে কৌশলে হালকা করে ফেলেন এলাকার একজন ঝিলকির জনৈক মামা । এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে ওই মামা সহ কিছু স্বজন ঝিলকির চুরি-ডাকাতি থেকে লোপাটকৃত স্বর্ণ-রোপ্য, মোবাইল অল্পদামে ক্রয় করে পরে চড়াদামে বিক্রি করতেন । এভাবে তারা রাতারাতি আঙ্গল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে ডাকাতির টাকা দিয়ে ডাকাত ঝিলকি ১০-১২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ছাদ দিয়ে ভবন উঠিয়েছে বাড়িতে। প্রবাদে আছে পাপে বাপরে ছাড়েনা এরই মধ্যে বুধবার দিবাগত রাত ৩ টায় শিবপাশা আঞ্জইন নামক ব্রিজের কাছে পুলিশ-ডাকাত গুলি বর্ষণের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় । ঝিলকির মৃর্ত্যুতে এলাকাবাসী সহ গোটা বানিয়াচংবাসীর মধ্যে স্বস্থি ফিরে এসেছে । কুখ্যাত ডাকাত ঝিলকিকে এতদিন যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আসছে তাদেরকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকার সচেতন মহল ।

মখলিছ মিয়া, বানিয়াচং (হবিগঞ্জ)

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *