বৌদ্ধ মন্দিরে ইফতার বিতরণ

প্রতিদিন বিকালে ইফতারের আগে রাজধানীর বাসাবোর ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারে লাইনে দাঁড়িয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের থেকে ইফতারের প্যাকেট নেন স্বল্প আয়ের মানুষরা।

ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ ও জিলাপির এই ইফতারের প্যাকেট ‘অসামান্য সম্প্রীতির’ নজির সৃষ্টি করছে বলে মনে করেন এলাকার বাসিন্দা বশীর আলী। দীর্ঘ দিন এই এলাকায় বাস করছেন তিনি।

“যখন শুনি পাহাড়ে সংখ্যালঘুদের উপর হামলা হচ্ছে, আর দেখি সেই সংখ্যালঘু বৌদ্ধরাই গরিবদের ইফতার করাচ্ছে, লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যায়,” বলেন বশীর আলী।

দুপুর থেকে রিকশা চালানোর পর বিকালে এখানে ইফতার নিতে আসেন বারিক মিয়া।

“আমি গত তিন বছর ধইরা আসি এইখানে। তারা যে ইফতার দেয়, আমার মতো মানুষগো অনেক উপকার হয়,” বলেন তিনি।

মান্ডা থেকে এখানে এদিন প্রথম আসেন বিউটি আক্তার। সঙ্গে নিজের দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে আসেন তিনি।

এই গৃহকর্মী  বলেন, “রোজা রাইখা প্রায়ই খালি পানি আর মুড়ি দিয়া ইফতার করা লাগে আমাগো। অন্য বুয়াদের কাছে শুইনা এখানে ইফতার নিতে আসছি।

“মানুষের ভালো করতে মুসলমান হওয়া লাগে না”

ইফতার বিতরণ কার্যক্রমে নিয়োজিত মহাবিহারের আবাসিক ভিক্ষু নিব্বুতি থেরো  বলেন, মানুষের মনে শান্তি আনাই তাদের মূল লক্ষ্য, তা সে যে ধর্মেরই হোক। প্রতিদিন এখানে তিনশ থেকে পাঁচশ জনের ইফতারের আয়োজন থাকে।

গত ১৬ বছর ধরে তারা রোজায় ইফতার বিতরণ করছেন জানিয়ে এই ভিক্ষু বলেন, “আমাদের ধর্মীয় গুরু সংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথেরো রমজানে দরিদ্র মানুষদের দুর্দশা দেখে এই ইফতার বিতরণ কার্যক্রমের সূচনা করেন।”

১৯৬৪ সালে স্থাপিত হওয়া আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দেশের বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের প্রধান ও বৃহৎ প্রার্থনালয় ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারের জন্মলগ্ন থেকেই আছেন শুদ্ধানন্দ মহাথেরো।

“আমাদের গুরু দেখলেন অনেকেই সারা দিন রোজা রেখে তেমন কিছু খেতে পান না, কেউ শুধু পানি দিয়ে ইফতার সারেন। তখন তিনি ভাবলেন মন্দিরের ফান্ড থেকেই ইফতারের ব্যবস্থা করা গেলে খুব ভালো হয়,” বলেন নিব্বুতি থেরো।

ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারে দরিদ্রদের মাঝে বিতরণের জন্য স্থানীয় রেস্তোরাঁ থেকে ইফতারি নিয়ে আসছেন এক কর্মী।

বিশৃঙ্খলা এড়াতে ইফতার নিতে আসা মানুষদের মাঝে কার্ড বিতরণ করছেন এক ভিক্ষু।

তিনি বলেন, রোজায় বিকাল ৫টা থেকে ৫টা ২০ মিনিট পর্যন্ত মন্দিরের দরজা খোলা থাকে, এ সময়ের মধ্যে যারা আসেন তাদের হাতে একটি করে টোকেন দেওয়া হয়। ইফতার বিতরণ স্থানে টোকেন দেখালেই ইফতার প্যাকেট মেলে।

“প্রতিদিন যত মানুষই হোক খালি হাতে ফেরানো হয় না কাউকেই। আরও লাগতে পেরে ভেবে বাড়তি খাবারের ব্যবস্থা করা থাকে।”

প্রতিদিন এই কাজে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ জন ভিক্ষু নিয়োজিত থাকেন বলে জানান নিব্বুতি থেরো।

তিনি জানান, প্রায় ১৬ বছর ধরেই ইফতার বিতরণ ছাড়াও প্রতি ঈদে এই মন্দির থেকে গরিবদের চাল, আলু, সেমাই, চিনি ও নারকেল দেওয়া হয়। নারী ও পুরুষদের মাঝে আলাদা করে শাড়ি ও লুংগি-পাজামা বিতরণ করা হয়।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *