দাঁতের নানারকম ক্ষয়রোগ

নশ্বর পৃথিবীতে সবকিছুই নশ্বর। সবকিছুর শুরু যেমন আছে তেমনি তার শেষও আছে। মাতৃগর্ভে আমরা থাকাকালীন আমাদের দাঁতের গঠন হয়ে থাকে। যখন শিশু ভূমিষ্ঠ হয় তখন থেকে ছয়-সাত মাস বয়সে শিশুর মুখে দুধদাঁত আসে, আবার জীবনের একটা পর্যায়ে এসে সে দাঁত হয় নষ্ট হয়ে যায় বা পড়ে যায়। মানবদেহে সবকিছুর ক্ষয় আছে। দেহের সবচেয়ে শক্ত যে উপাদান যেটি দাঁতের এনামেল নামে পরিচিত সেটিও একটা সময় ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ধীরে ধীরে মজ্জার দিকে যায়। লিখেছেন- ডা: নাহিদ ফারজানা

অনেকেই আছেন যারা ‘দাঁতের ক্ষয়’ হচ্ছে কথাটি শুনলে হেসে উড়িয়ে দেবেন। তবে তখনই তারা বুঝতে পাবেন যখন নিজের দাঁতে শিরশির বা ব্যথা অনুভূত হয়। দাঁতের নানারকম ক্ষয় আছে তার মধ্যে কয়েকটি ক্ষয়ই বেশি হয়ে থাকে যেমন: দাঁতে দাঁত ঘর্ষণের ফলে ক্ষয়। শক্ত ব্রাশ বা বস্তু দ্বারা দাঁত ঘষা মাজার কারণে ক্ষয়। অম্লতার কারণে সৃষ্ট ক্ষয় ব্যাকটেরিয়াজনিত ক্ষয় ইত্যাদি।
দাঁতে দাঁতে ঘর্ষণের সৃষ্টি ক্ষয়

ত্রুটিপূর্ণ অভ্যাসের কারণে দাঁতে এ জাতীয় ক্ষয় হয়ে থাকে। অনেকেই আছেন যারা রাতে ঘুমের মধ্যে নিজের অজান্তেই দাঁতে দাঁত কাটেন। এতে দাঁতের ক্ষতি হয়। যারা বেশি আঁশযুক্ত শক্ত খাবার খান তাদের দাঁতেও এ রকম ক্ষতি হয়ে থাকে। দাঁতে দাঁত ঘর্ষণের ফলে দাঁতের অগ্রভাগ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে থাকে। এই ক্ষয়ের পরিমাণ বাড়তে থাকলে এনামেল ক্ষয় হয়ে ডেন্টিন এবং শেষে মজ্জা আক্রান্ত হয়। তখন দাঁতে ব্যথা পর্যন্ত হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, দাঁত এত বেশি ক্ষয় হয় যে, দাঁত এবং মাড়ি সমান হয়ে যায়।
চিকিৎসা
রাতে ঘুমের মধ্যে দাঁত কাটার অভ্যাস থাকলে ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ মোতাবেক তার চিকিৎসা নিতে হবে। এ ছাড়া বেশি আক্রান্ত দাঁতগুলোকে রুট ক্যানেল করে ক্রাউন করে দাঁত সংরক্ষণ করা যায়।
ভুল পদ্ধতিতে দাঁত পরিষ্কার করার অভ্যাসের ফলে সৃষ্ট ক্ষয়

ভুল পদ্ধতিতে দাঁত পরিষ্কার করলে দাঁতের ক্ষয় হয়। নিয়ম হলো দাঁত ব্রাশ করতে হবে উপর নিচ বরাবর। কিন্তু সে ক্ষেত্রে যদি পাশাপাশি দাঁত ব্রাশ করা হয় দাঁত এবং মাড়ির সংযোগস্থল বরাবর দাঁত ক্ষয় হয়ে যায়। এ ছাড়াও কয়লা, বালু, কাদামাটি, ছাই ইত্যাদি দিয়ে জোরে জোরে দাঁত মাজলে প্রাথমিকভাবে হাসিতে মুক্তা ছড়ালেও পরবর্তী সময় দাঁতের ব্যথায় কাঁদতে হবে। এ ক্ষেত্রে দাঁতের ক্ষয়ের পরিমাণ বেশি হলে এবং চিকিৎসা না করলে দাঁত যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে।
চিকিৎসা
সঠিক নিয়মে অবশ্যই নরম ব্রিসনাযুক্ত ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজতে হবে।
কয়লা, পাথর, বালু গুল, ছাই ইত্যাদি দানাদার মাজন বাদ দিয়ে টুথব্রাশ, টুথপেস্ট ব্যবহার করতে হবে। দাঁতের ক্ষয় হয় বুঝতে পারার সাথে সাথে দেরি না করে অভিজ্ঞ ডেন্টাল সার্জনের শরণাপন্ন হতে হবে।
অম্লতার কারণে সৃষ্ট দাঁতের ক্ষয় রোধ

একজন অভিজ্ঞ ডেন্টাল সার্জন রোগীর অতীত ইতিহাস না জেনেও শুধু রোগীর দাঁত দেখে বলে দিতে পারেন যে, রোগী অম্লতায় ভুগছেন। যারা টকজাতীয় খাবার বেশি খান যেমন সফট ড্রিংকস, অ্যালকোহল অথবা ফলের রস; তাদের দাঁতের এই ক্ষয় রোগ বেশি হয় এ ছাড়াও যাদের টক ঢেঁকুর বেশি ওঠে এবং গ্যাস্ট্রিক সেন্টনোসিসের রোগীদের এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। এতে উপরের তালুর দিকের দাঁত বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এ ছাড়া দাঁতের যেকোনো জায়গাতেও এটি হতে পারে। আমাদের দেশে তো কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি লোকালয়েও স্থাপিত হয়ে থাকে। এসব ইন্ডাস্ট্রি থেকে বেরিয়ে আসা রাসায়নিক ধোঁয়া দাঁতের গায়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে। এ ছাড়া যাদের গলায় আঙুল দিয়ে বমি করার অভ্যাস আছে তাদেরও এ রকম সমস্যা হতে পারে।
চিকিৎসা
প্রাথমিক অবস্থায় কারণ খুঁজে বের করে তা দূর করার চেষ্টা করতে হবে। অভিজ্ঞ ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাকটেরিয়াজনিত দাঁতের ক্ষয়

খাদ্যগ্রহণ করার পর ঠিকভাবে দাঁত পরিষ্কার না করলে দাঁতের গায়ে খাবার পচে ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয় এবং পরে গাঁজনপ্রক্রিয়ায় দাঁতের এনামেল নষ্ট হয়ে ক্যারিজ তৈরি হয়। চিকিৎসা না করলে দাঁতে ব্যথা হয়। পরবর্তী সময় দাঁতের বৃহত্তম অংশ নষ্ট হয়ে গিয়ে দাঁত ভেঙে যেতে পারে।
চিকিৎসা
নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করতে হবে। প্রতিবার খাবারের পর কুলি করতে হবে। দাঁতে ছোটখাটো গর্ত তৈরি হওয়া দেখলে সময়ক্ষেপণ না করে অভিজ্ঞ ডেন্টিস্টের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা নিতে হবে।

দাঁতের এ জাতীয় ক্ষয় ছাড়া আরো অনেক রকমের ক্ষয় হতে পারে। যারা চুলের ক্লিপ দাঁতে চাপ দিয়ে খোলে তাদের দাঁতের মাঝখানটা গর্ত হয়ে যেতে পারে। যে মেয়েরা বিউটি পার্লারে কাজ করে তারা ভ্রু প্লাক করার সময় দাঁত দিয়ে সুতা টেনে কাজ করে তাদেরও একই রকমের দাঁত ক্ষয় হয়ে থাকে। আবার অনেকের দাঁত দিয়ে নখ কাটার অভ্যাস আছে। এদেরও একই রকমের দাঁত ক্ষয় হয়। দাঁতে যে রকমের সমস্যাই দেখা যাক না কেন সময় নষ্ট না করে অভিজ্ঞ ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ ও চিকিৎসা নেয়াই শ্রেয়।

লেখিকা : কনসালটেন্ট ডেন্টাল সার্জন, নাহিদ ডেন্টাল কেয়ার, ১১৭/১, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *