বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সেনাপ্রধান গাডি আইজেনকোটকে দেশটির পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ।
গত ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায়, পরবর্তী সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করতে এই সপ্তাহে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে পরামর্শ সভা করেন প্রেসিডেন্ট হারজোগ।
নেসেটের (ইসরাইলি পার্লামেন্ট) ১২০টি আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য ন্যূনতম জাদুকরী সংখ্যা বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে আইজেনকোটের হাতে ২৮ দিন সময় থাকবে; প্রয়োজনে এই সময়সীমা আরো ১৪ দিন বাড়ানো হতে পারে।
অক্টোবরের নির্বাচনে আইজেনকোটের চারদলীয় জোট ৪৮টি আসন জিতেছিল এবং নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও ধর্মীয় ব্লক জিতেছিল ৫৩টি আসন। ফলে উভয় পক্ষই সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন থেকে পিছিয়ে পড়ে। তবে ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলো রেকর্ড ১৯টি আসন জিতেছে।
আইজেনকোট আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সাথে মিলে সরকার গঠন করার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন, যা তাঁর পক্ষে থাকলে মোট ৬৭টি আসন হতে পারত। তবে অতি-রক্ষণশীল দুটি দল—‘ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম’ এবং ‘শাস’-কে নিজের জোটে ভেড়াতে পারলে তিনি ঠিক ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারবেন।
এছাড়া পার্লামেন্টে আস্থার ভোটে জয়ী হলে তিনি ৬১ আসনের কম নিয়েও সরকার গঠন করতে পারেন।
অকুপায়েড ওয়েস্ট ব্যাংক বা অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক নূর ওদেহ প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানান যে, যেহেতু আইজেনকোটের পক্ষে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সুপারিশ ছিল, তাই প্রেসিডেন্ট 'সবচেয়ে অনুমেয় পথটিই বেছে নিয়েছেন।'
নূর ওদেহ বলেন, 'আইজেনকোটের জন্য এখন কঠিন কাজ শুরু হবে। তাকে এমন একটি সরকার গঠন করতে হবে, যা নেসেটে আস্থার ভোট পার হতে পারবে : প্রথমত, নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা খুব বেশি ভঙ্গ করবে না; এবং দ্বিতীয়ত, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী ব্লকের বিরোধিতাকে মোকাবিলা করে টিকে থাকতে পারবে।'
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইজেনকোট সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট হারজোগ অন্য কোনো প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবেন। দ্বিতীয় মনোনীত ব্যক্তিও ব্যর্থ হলে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা সম্পন্ন একটি দল তৃতীয় কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দিতে পারবে, যাকে চূড়ান্তভাবে আরো ১৪ দিন সময় দেওয়া হবে।
যদি এরপরেও কোনো সরকার গঠিত না হয়, তবে ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন ঘোষণা করা হবে এবং এই সময়ের মধ্যে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
নেতানিয়াহু সরকারবিরুদ্ধে ঐক্য
২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আইজেনকোট। এছাড়া ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজায় ইসরাইলের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের প্রথম আট মাস তিনি নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার একজন পর্যবেক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
১১টি আসনধারী আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর জোট ‘জয়েন্ট লিস্ট’-এর জ্যেষ্ঠ সদস্য আহমেদ তিবি শনিবার আল জাজিরাকে জানান, প্রেসিডেন্ট হারজোগের এই সিদ্ধান্তটি ছিল 'প্রত্যাশিত'।
তিনি বলেন, 'আমাদের শঙ্কা ছিল যে প্রেসিডেন্ট হয়তো একটি জাতীয় ঐক্যের সরকারের দিকে ঝুঁকতে পারেন।' (তিনি মূলত আইজেনকোট ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাবিত চুক্তির কথা ইঙ্গিত করছিলেন)।
এর পরিবর্তে আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলো আইজেনকোটকে ম্যান্ডেট দেওয়ার জন্য সমর্থন জানায়, যা তাকে একটি 'উল্লেখযোগ্য ব্যবধান' এনে দিয়েছে।
আহমেদ তিবি বিশ্বাস করেন যে আইজেনকোট 'আরব দলগুলোর বাহ্যিক সমর্থনে' একটি সংখ্যালঘু সরকারের দিকে এগোচ্ছেন।
এটি আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর জন্য 'স্বপ্নের সরকার' না হলেও তিবি 'নেতানিয়াহু, [ইতামার] বেন-গভির এবং [বেজালেল] স্মোট্রিচের সরকারকে' ক্ষমতাচ্যুত করাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছিলেন যে, আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থনে বিরোধী জোটের গড়া সরকার ইসরাইলের পতনের কারণ হবে।
একটি পূর্ব রেকর্ড করা ভিডিও ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, 'ইসলামপন্থীদের ওপর নির্ভরশীল এমন একটি সরকার ভেতর থেকে ইসরাইল রাষ্ট্রকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে, যেমনটা আজ ইউরোপের দেশগুলোতে ঘটছে, এমনকি তার চেয়েও খারাপ কিছু ঘটবে।' চরমপন্থী রাজনীতিকদের এই ভাষণের মাধ্যমে তিনি মূলত ইউরোপের কিছু অংশ ইসলামিক আইনের অধীনে চলে গেছে বলে ছড়ানো মিথ্যা প্রপাগাণ্ডার সুরই পুনরাবৃত্তি করেন।
আহমেদ তিবি জানান যে নেতানিয়াহু 'আমাদের সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসবাদের সমর্থক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।' এর জবাবে তিবি বলেন, 'আমার উত্তর হলো : নেতানিয়াহু হলেন ইসরাইল ও এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী এবং সন্ত্রাসবাদের প্রধান সমর্থক, বিশেষ করে পশ্চিম তীর ও ফিলিস্তিনি অঞ্চলে ইহুদি সন্ত্রাসবাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক।'
আল জাজিরার সাংবাদিক নূর ওদেহ উল্লেখ করেন যে, যদিও আইজেনকোট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন তিনি আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সাথে সরকার গঠন করতে চান না, তবুও 'নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো যথেষ্ট শক্ত ও বাধ্যতামূলক কারণ উভয় পক্ষের মাঝেই রয়েছে।'
সূত্র : আল জাজিরা