দেশের ব্যাংকিং খাতে নগদ টাকার সঙ্কটের চাপ বাড়ছে। তারল্য ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকগুলোর চাহিদা মেটাতে এক দিনেই প্রায় ছয় হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা সরবরাহ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বিভিন্ন নীতিগত ও স্বল্পমেয়াদি আর্থিক উপকরণের মাধ্যমে এই তারল্য সরবরাহ করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে একাধিক মেয়াদে রেপো ও অ্যাসিউরড রেপো (এআর) সুবিধার আওতায় অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে। একই সাথে স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) মাধ্যমে ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ গ্রহণ এবং আগের সরবরাহ করা অর্থের মেয়াদপূর্তির হিসাব সমন্বয় করা হয়েছে। সবমিলিয়ে ওই দিন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নিট তারল্য সরবরাহের পরিমাণ প্রায় ছয় হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর এক দিনের সেন্ট্রাল ব্যাংক রেপো বা সিবি রেপোর আওতায় চার হাজার ৬৯১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা সরবরাহ করা হয়েছে। এই অর্থের সুদহার ছিল ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ বা সংরক্ষিত নগদ অর্থের প্রয়োজন মেটাতে এ ধরনের স্বল্পমেয়াদি অর্থায়ন করা হয়।
অন্য দিকে অ্যাসিউরড রেপো বা এআর সুবিধার আওতায় এক দিনের জন্য ৭৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা এবং সাত দিনের জন্য ২৫১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা সরবরাহ করা হয়েছে। এই দুই ক্ষেত্রেও সুদহার ছিল ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। সবমিলিয়ে সিবি রেপো ও এআর সুবিধার আওতায় নতুন করে অর্থ সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৭২২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। তবে ১৪ দিনের এআর সুবিধার আওতায় ওই দিন নতুন কোনো অর্থ সরবরাহ করা হয়নি। এ খাতে নতুন অর্থের পরিমাণ ছিল শূন্য। বিপরীতে আগের লেনদেনের মেয়াদপূর্তির কারণে এক হাজার ২০২ কোটি ৯৯ লাখ টাকার সমন্বয় হয়েছে। ফলে সিবি রেপো ও এআর কার্যক্রমের সম্মিলিত নিট অর্থ সরবরাহ দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৫১৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
এ দিকে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখার সুবিধা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি বা এসডিএফের আওতায় ওই দিন চার হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা জমা নেয়া হয়েছে। এই সুবিধার সুদহার ছিল ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে আগের এসডিএফ লেনদেনের মেয়াদপূর্তির কারণে ছয় হাজার ৪৫৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফেরত এসেছে। ফলে এসডিএফের মেয়াদপূর্তি ও নতুন জমার সমন্বয়ে নিট এক হাজার ৮৭৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে এসেছে।
সব উপকরণের লেনদেন ও মেয়াদপূর্তির হিসাব সমন্বয়ের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর ব্যাংকিং খাতে নিট তারল্য সরবরাহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৩৯৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ, বিভিন্ন খাতের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ ও ফেরত দেয়ার হিসাব সমন্বয় করে ওই দিন ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রায় ছয় হাজার ৪০০ কোটি টাকার নিট তারল্য যুক্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে তারল্য ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ ধরনের অর্থ সরবরাহ একটি নিয়মিত নীতিগত কার্যক্রম। কোনো ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেন, আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলন, আন্তঃব্যাংক লেনদেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিধিবদ্ধ নগদ জমা সংরক্ষণের প্রয়োজন মেটাতে স্বল্পমেয়াদি অর্থের চাহিদা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কোনো ব্যাংকের আমানত প্রবাহের তুলনায় ঋণ বিতরণ ও নগদ অর্থের চাহিদা বেশি হলে সাময়িক তারল্য সঙ্কট দেখা দিতে পারে। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপো ও অন্যান্য সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এক দিনে প্রায় ছয় হাজার ৪০০ কোটি টাকার নিট তারল্য সরবরাহের বিষয়টি ব্যাংকিং খাতের নগদ অর্থের চাহিদার দিকে নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। কারণ ব্যাংকগুলোকে প্রতিদিন আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার পাশাপাশি ঋণ বিতরণ, আমদানি-রফতানি কার্যক্রম, সরকারি লেনদেন ও অন্যান্য আর্থিক দায় মেটাতে হয়। এসব ক্ষেত্রে নগদ অর্থের পর্যাপ্ততা না থাকলে ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে বড় অঙ্কের স্বল্পমেয়াদি অর্থ নেয়া মানেই পুরো ব্যাংকিং খাতে স্থায়ী বা কাঠামোগত তারল্য সঙ্কট তৈরি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। তবে নিয়মিতভাবে বড় অঙ্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংক-নির্ভর অর্থায়নের প্রয়োজন দেখা দিলে তা ব্যাংকগুলোর আমানত ও ঋণ ব্যবস্থাপনা, নগদ অর্থের প্রবাহ এবং আর্থিক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোন ব্যাংক কতটা অর্থ নিচ্ছে, কত দিন ধরে নিচ্ছে এবং কী কারণে নিচ্ছে, তা বিশ্লেষণ করা জরুরি।
এ অবস্থায় ব্যাংকগুলোর আমানত সংগ্রহ বাড়ানো, ঋণ বিতরণে সতর্কতা, খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার এবং নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও বাজারে তারল্যের প্রবাহ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ সরবরাহ ও প্রত্যাহারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। সবমিলিয়ে ২৯ অক্টোবরের প্রায় ছয় হাজার ৩৯৫ কোটি টাকার নিট তারল্য সরবরাহ ব্যাংকিং খাতে নগদ অর্থের চাহিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তবে এ পরিস্থিতি সাময়িক, নাকি ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদি তারল্যচাপের প্রতিফলন, তা বুঝতে পরবর্তী দিনগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ সরবরাহের প্রবণতা, ব্যাংকগুলোর আমানত পরিস্থিতি এবং আন্তঃব্যাংক অর্থবাজারের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।