ইতিহাসের ঘৃণ্যতম নির্বাচন হয়েছে বাংলাদেশে : রিজভী

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ওপর জুলুম করা হচ্ছে জানিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সরকার আর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মিথ্যা আশ্বাসে সব দল নির্বাচনে এলো। কিন্তু পুলিশ, ডিবি, বিজিবি, র‌্যাব, বিচার বিভাগ, সিভিল প্রশাসন, দুদক আর নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ কাজে লাগিয়ে ইতিহাসের ঘৃণ্যতম এই নির্বাচন সংঘটিত করা হলো। শুক্রবার সকালে নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে রিজভী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ৩৬ বছর রাজনৈতিক জীবন পূর্ণ হলো গতকাল। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন। এর দুই মাসের মধ্যে গণতন্ত্র হত্যা করে এইচ এম এরশাদ সামরিক শাসন জারি করেন। ফলে আবারো বন্ধ হয়ে যায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের এগিয়ে যাওয়া। কণ্ঠরোধ করা হয় জনগণের। জাতীয় জীবনের ওপর দুঃসময় নেমে আসে। এ রকম এক ক্রান্তিকালে শুরু হয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন। সেই আন্দোলনে বেগম জিয়ার অবদান বীরুত্বগাঁথা। নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রামে তিনি জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে একক ও অনন্য নেতৃত্বে সুপ্রতিষ্ঠিত হন। দীর্ঘ ৯ বছরের সংগ্রামে, সংকটে আপসহীন ধারায় জনগণের সাথে অঙ্গীকার রক্ষা করে তিনি গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। শুরু হয় গণতন্ত্রের পথ চলা। তার ৩৬ বছর রাজনৈতিক জীবনে দেশ ও জাতির প্রতি অবদানের জন্য আমরা আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমরা তার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।’

রিজভী বলেন, ‘দেশী-বিদেশী চক্র এই মহান জাতীয়তাবাদী নেত্রীর উত্থান সহ্য করতে পারেনি। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে যিনি আগলে রেখেছিলেন অতন্ত্র প্রহরীর মতো তাকে পর্যুদস্থ করার জন্য চক্রান্তকারীরা চক্রান্তের জাল বুনতে থাকে। ভোটারশূন্য নির্বাচনে বিদেশী মদদপুষ্ট অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদী শক্তি গণতন্ত্রকে দাফন করতে বেগম জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে আটকে রেখে জুলুমের পর জুলুম চালিয়ে যাচ্ছে। বিনা চিকিৎসা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং কারাবিধিনুযায়ী নিকটজনদের সাক্ষাৎ করতে নানা ফন্দি ফিকির করে বিলম্ব করা হচ্ছে। মূলত ৭ দিন পর পর আত্মীয়-স্বজনদের দেখা করার কথা। অথচ বেগম জিয়ার জন্য কারাকর্তৃপক্ষ ১৫ দিন পর পর সাক্ষাতের বিধান করে। এবারে ২০/২১ দিন অতিবাহিত হলেও দেশনেত্রীর সাথে তার আত্মীয়-স্বজনদের সাক্ষাৎ করতে দেয়া হয়নি। দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ও দেশনেত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসকবৃন্দ বিগত ৪ মাস ধরে বেগম জিয়ার সাথে দেখা করতে পারছেন না।’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, ‘স্মরণকালের সবচেয়ে জঘন্য মহাজালিয়াতির নির্বাচন হয়েছে বাংলাদেশে। সারাদেশে অধিকাংশ আসনের অনেক কেন্দ্রে আগের রাতে ব্যালট দিয়ে বাক্স ভর্তি করে রাখা হয়েছে। ফলে ভোটের দিন বহু কেন্দ্রে সকাল ১০/১১ টার মধ্যে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যায়। হাজার-হাজার লোক ভোট দিতে এসে ভোট দিতে পারেনি। সব কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ কাজ খুব ধীর গতিতে করা হচ্ছিল। কারণ, শুরু থেকেই বাইরে থেকে ভোটার আসার সময় পাশাপাশি ভিতরে ব্যালট অবৈধ সিল মারার কাজ চলছিল। ভোটের আগের রাত পর্যন্ত পুলিশ, ডিবি, আওয়ামী লীগ কর্মীদের ভূমিকায় বহু কেন্দ্রে এজেন্ট দেয়া সম্ভব হয়নি। ভোটের দিন এজেন্ট ঢুকতে দেয়া হয়নি অথবা মারপিট করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। এরপর বিভিন্নভাবে সিল মেরে ব্যালট বাক্সে ঢোকানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ কর্মীরা ছাড়া উপরোক্ত সকল কাজের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল পুলিশ, ডিবি, আনসার ও বিভিন্ন স্তরের সিভিল প্রশাসন।’

তিনি বলেন, ‘এসব কিছু বন্ধ করতে ইসি শুধু যে কিছুই করেনি তা নয়, তারা সকল আদেশ-নিয়ম এভাবে জারি করেছে যেন এসবকিছু নির্বিঘেœ নিখুঁতভাবে করা যেতে পারে। নির্বাচনের আগের কয়েক সপ্তাহে বিরোধীদের মিছিলে হামলা করা হয়েছে, আহত করা হয়েছে, মাইক কেড়ে নেয়া হয়েছে, নির্বাচন প্রচার-প্রচারণা অফিস ভাংচুর করা হয়েছে। পুলিশ ডাকলে পুলিশ আক্রান্তদের গ্রেফতার করেছে, মামলা দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ নিজেরাই ওই কাজ করেছে। বহু প্রার্থীকে আহত ও গ্রেফতার করা হয়েছে। বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে, প্রচারণায় যেতে দেয়া হয়নি, নির্মম-নির্যাতনের শিকার করা হয়েছে। অধিকাংশ আসনে প্রচারণা করতে দেয়নি। পোস্টার টাঙ্গাতে দেয়নি। পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। বিরোধী নেতাকর্মী এমনকি সাধারণ সমর্থকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয়-ভীতি দেখানো হয়েছে, ভাংচুর করা হয়েছে, আগুন লাগানো হয়েছে, অনেকে বাড়ি ছাড়া হয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে। এতকিছুর পরও লাখ-লাখ ভোটার সাহস করে ভোট দিতে বেরিয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশ ভোট দিতে পারেনি। কারণ নির্বাচনটি ছিল সম্পূর্ণ প্রহসন, প্রতারণা আর জালিয়াতিতে পরিপূর্ণ। দেশ ও জাতির প্রতি এত বড় প্রতারণা ও জালিয়াতির জন্য বলতে চাই বিনা চ্যালেঞ্জে এবং বিনা শাস্তিতে চলে যেতে দেয়া যায় না। জনগণের আদালতে প্রকাশ্যে এগুলোর বিচার একদিন হবেই।’

রিজভী জানান, ময়মনসিংহ-২ নির্বাচনী এলাকার ফুলবাড়িয়া বিএনপির নেতা আবদুর রশিদকে নির্বাচনের দিন আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বেদম মারপিট করে। পরে তাকে ময়মনসিংহ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ সকালে তার মৃত্যু হয়। রমনা থানার ১৯ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুল মোতালেব রুবেল প্রেসক্লাবে মানববন্ধনে অংশগ্রহণের পর বাসায় ফেরার সময় মালিবাগ থেকে গ্রেফতার করে রামপুরা থানায় নিয়ে যায়। জামিন পাওয়ার পর গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে পুনরায় জেলগেট থেকে আটক করে রমনা থানায় নিয়ে যায়। তাকে চোখে কাপড় বেঁধে প্রচুর মারধর করে এবং পুনরায় রিমান্ড মঞ্জুর করায়। ছাত্রদল ঢাকা মহানগর পশ্চিমের সাংগঠনিক সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়নকে পুনরায় দুই দিনের রিমান্ডে এনে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করছে। তার মাগুরার বাড়িতে বাবা-মা, দাদা-দাদী, ভাই-বোন, সবাইকে বাড়িছাড়া-এলাকা ছাড়া করা হয়েছে। এক অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে নয়নের পরিবার দিন যাপন করছে। সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হোসেন জীবন আদালতে জামিন নিতে এলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত সহকারী অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসকে নতুন কোনো মামলায় গ্রেফতার না দেখাতে হাইকোর্টে নির্দেশ থাকলেও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নতুন এক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আটক রাখা হয়েছে। মিথ্যা মামলায় জামিন নিতে গিয়ে সাবেক এমপি আকবর আলী খানকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমানকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়েছে।

print

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *